Image

আমার সিক্কিম ডায়েরি

মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা

মন খারাপ হলেই কুয়াশা হয়, ব্যকুল হলে তিস্তা

বাগান শেষে সদর দুয়ার, বারান্দাতে আরাম চেয়ার
গালচে পাতা বিছানাতে ছোট্ট রোদের ফালি..
সেথায় এসে মেঘ পিয়নের সমস্ত ব্যাগ খালি..

 

সেই সমরেশ মজুমদার এর আট কুঠুরি নয় দরজা থেকে আমার এই প্রেম এর শুরু। অনেক টা তারে আমি চোখে দেখিনি, তার অনেক গল্প শুনেছি টাইপ। গল্পে দার্জিলিং এর নাম কি সরাসরি এসেছিলো, মনে হয় না। কিন্তু আমার মনে দার্জিলিং টাই গেথে গেছে। আর ফেলুদা, টেনিদা এর ডুয়ার্স এর জংগল এর কথকথা আমার মত ঘরকুনো মানুষ এর মনে যেনো বেশ গাড় দাগ কেটে গেছে সেই শৈশব এ ই।

 

এই দার্জিলিং প্রেম এর টানে বেশ কিছু বছর আগে একবার খুব ছোট্টো ছুটি নিয়ে শৈল শহর টি ঘুড়ে দেখার সুযোগ হইয়ে গিয়েছিলো। এই ঘরকুনো ছেলেটা এর পর পাহাড়ের প্রেমে পরে যায়। এরপর থেকে পাহাড় তাকে টানে। সামান্য ছুটি তে দার্জিলিং দেখে মন ভরে না যেনো। প্রতি বছর ই সে প্ল্যান করে এবার বেশ লম্বা ছুটি নিয়ে শুকনা, রিশপ বা রামতাং এর কোনো গ্রামে গিয়ে দু চার রাত কাটিয়ে আসবে। কিন্তু হয় না। ছুটি নাই অথবা যাবার সাথী নাই। একা ঘুরতে যাবার মজা হয়তো আলাদা, কিন্তু আমার হইহুল্লোড় ভালো লাগে। আবার উপরের গানটা শুনলে মনে হয় যাই না একাই চলে যাই। ঝুম বৃষ্টি তে যখন নতুন বিয়ে করা কাপল, অবসর কাটাতে আসা পর্যটক এর ভীড় থাকবে না, আমার মতন একা মানুষ যারা আরো একা হতে চায় তারা থাকবে শুধু। পাহাড় বেয়ে ঢল নামবে, রাস্তা থাকবে বন্ধ, অফিসে থেকে ১০ – ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে চলে যাবো পাহাড়ে। অথবা খুব ঠান্ডা যখন হবে, পাহাড়ের কালো মাটি আর কালো থাকবে না, হয়ে যাবে সাদা ধবধবে স্বর্গের দরজার মত, তখন এক কাপ চা বা কফি হাতে কোনো একটা হোটেল রূম থেকে সাদা দৈত্য টার দিকে তাকায়ে থাকবো।

যাই হোক, গত বছর থেকে প্ল্যান করে যাচ্ছি আবার দার্জিলিং যাবো। কিন্তু ছুটি মিলছে না। মন খুব খারাপ। দার্জিলিং এর পর ভূটান এর প্ল্যান ও করে ফেললাম, এক্সেল এ, ওয়ার্ড এ আইটেনারি ও তৈরি। বেশ কয়েকজন রেডি যে তারা যাবে। কিন্তু ছুটি টাই মিলছে না। মন খুব খারাপ। ঠিক এর মাঝখানে সিক্কিম বাংলাদেশী দের জন্যে খুলে দিলো। আহা, বরফ, সাদা সাদা বরফ পাহাড়ের খাজে ভাজে পরে আছে। পাহাড়ি আকাবাকা রাস্তা বেয়ে একদল মানুষ বরফ নিয়ে খেলছে। ফেসবুকে দেখি আর মন হুহু করে ওঠে। ফেব্রুয়ারী – মার্চ পর্যন্ত চলে আমার ছুটি নিয়ে যুদ্ধ। আমি ভিসা তৈরী করে রেডি। আমার পরে আমার আশে পাশে অনেক কলিগ এর ভিসা হেল্প করে দিলে তারা মাঝে দুইবার ইন্ডীয়া ঘুরে চলে আসে, কিন্তু আমার ছুটি মিলে না। শেষ পর্যন্ত মিলে গেলো এপ্রিলের ১৫ – ১৭, সাথে ১২, ১৩, ১৪ সরকারী ছুটি মিলে ছয় দিনের ছুটি। এবার বুঝি সাদা পাহাড় কে চুমু খাবার দিন। পাহাড়ের সাথে মিলন এর দিন। দার্জিলিং আবার কখনো হয়তো যাওয়া যাবে, এবার তবে সিক্কিম থেকেই ঘুড়ে আসি।

 

কিন্তু এবার সমস্যা যাত্রা পথের সাথী একজন। কিন্তু সিক্কিম এর যত রিভিউ পরি সবাই বলে ৬ – ৭ জন হলে ভালো হয়। ফেসবুকে পোষ্ট করি একটা ট্রাভেল গ্রুপে। কয়েকজন সারা দিলেন। পরে আমার অফিস এর ই এক কলিগ, তার দুই বন্ধু, আর ফেসবুক গ্রুপের দুই বাচ্চা ছেলে মিলে শুরু হলো আমাদের সিক্কিম যাত্রা।

 

প্রারম্ভিক ভাবনা চিন্তাঃ

 

আমার ভিসা নেয়া ফুলবাড়ী দিয়ে। সব কিছু বিবেচনা করে আমার কাছে ফুলবাড়ি টাই বেস্ট মনে হয়েছে, কারণ হচ্ছে –

১) ফুলবাড়ি বা চ্যাঙড়াবান্ধা কোনো পোর্ট ই ৯ টার আগে খোলে না

২) দুই পোর্ট এ ই বেশ সময় লাগে ফর্মালিটিজ শেষ হতে, আপনার ১ – ১.৩০ ঘন্টা খেয়ে দিবে।

৩) ফুলবাড়ী থেকে শিলিগুড়ী মাত্র ২৫ – ৩০ মিনিটের রাস্তা

৪) আপনি যেদিন বিকেল বা সন্ধ্যায় সিক্কিম পৌছাবেন, সেদিন আসলে কিছুই করার নাই, হোটেল খোজা, পরদিন লাচুং এ যাবার জন্যে প্যাকেজ নেয়া আর খাওয়া দাওয়া করা ছাড়া সেদিন আপনার আর কোনো এক্টিভিটিই নাই, তাই বিকেল এ গেলেই কি আর সন্ধায় গেলেই কি

৫) ট্যুরিজম অথরিটি যেদিন ট্যুর এ যাবেন সেদিন ই পার্মিশন দিবে, আগের দিন না, সকাল ৬ টা থেকে ৭.৩০ টা পর্যন্ত সাঙ্গু এর পার্মিশন আর ৭.৩০ টার পর থেকে লাচুং ইয়ুংথাম এর পার্মিশন দেয়, খুব সম্ভবত বেলা ১১ টা পর্যন্ত।

 

এবার আসি আমার জার্নি নিয়ে, আমি সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারি না, আমি গল্প বলি না, লেখক না। আমার কাছে সৌন্দর্যের বর্ণনা মানে হচ্ছে, ভাভারেভাভা কিয়েক্টাবস্থা, হা কইরা তাকায়া আছিলাম।

এই জন্যে আমি শুধু আমার ভ্রমণ এর কিছু ইনফো শেয়ার করার চেষ্টা করবো –

 

রাত ১ – (১১ই এপ্রিল)

 

আমি একটু অলস এবং রিলাক্স ভাবে যেতে চাচ্ছিলাম, তাই ট্রেন বেছে নিলাম। আমাদের প্ল্যান হলো ট্রেন এ পঞ্ছগড় গিয়ে সেখান থেকে বাস বা মাইক্রো তে বাংলাবান্ধা বর্ডার এ পৌছানো। বেশ টানাটানি চলছে টিকিট এর। ৩ দিনের ছুটি। আমার কলিগ মিতন ভাই এর মাঝখানেই তার আর আমার ট্রেন এর এসি বগির দুইটা টিকিট ম্যানেজ করে ফেললো। তার দুই বন্ধু আসবে বাস এ বর্ডার এ। আর গ্রুপ এর বাচ্চা দুইটা আসবে চ্যাংড়াবান্ধা হয়ে।

যাই হোক, দ্রুতযান এক্সপ্রেস রাত ৮ টায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে সকাল ৮ টা কি ৮.৩০ এ পৌছানোর কথা পঞ্ছগড় শহর এ। ছেড়ে গেলো ট্রেন ঠিক ৮ টায়, কোনো হেরফের নেই। টানা তিন দিনের ছুটি তাই নরমাল বগী তে খুব ভীড়, আমাদের ছিলো স্নিগ্ধা, এখানে টিকীট ছাড়া কোনো লোক নাই। আপাতত আমি আর আমার কলিগ এই দুইজন ই রওনা হলাম।

 

দিন ১ – রাত ২ (১২ই এপ্রিল)

 

ট্রেন যথারীতী লেট করে সকাল ৯ টায় পৌছালো। ভাগ্য কি ভালো আমরা যখন ট্রেন থেকে নামি কলিগ এর দুই বন্ধু ও ঠিক এক ই সময় এ পঞ্ছগড় শহর এ পৌছান। এখন রেল স্টেশন থেকে বাংলাবান্ধা বর্ডার বেশ দূরে, বাসে প্রায় ২ ঘন্টার কাছাকাছি লাগে যেতে। আপনারা স্টেশন থেকে অটোতে করে বাস স্টেশন এ চলে যেতে পারেন, সেখান থেকে প্রতি ১৫ – ২০ মিনিট পরপর তেতুলিয়া হয়ে বাংলাবান্ধার বাস পাবেন। আমরা ঢাকা থেকেই যোগাযোগ করে একটা মাইক্রো ঠিক করে নিয়েছিলাম দুইজন এর জন্যে, কিন্তু মিতন ভায়ের ফ্রেন্ড রা চলে আসায় আমরা চারজন মাইক্রো তে করে চলে আসলাম মাত্র ৪০ মিনিট এ।

এখানে সব খাপছাড়া বর্ডার এ। কোন রূম থেকে কোন রূম এ যাবে, ক্যান যাবেন সেটা খুব ই ধাধার মত একটা ব্যাপার। আপনি ইমিগ্রেশন এ সিল নিয়ে কাস্টমস ক্লিয়ার না করেও যদি বের হয়ে যান, বা ট্রাভেল ট্যাক্স না দিয়ে ও যদি বের হয়ে যান, কেউ যেনো আপনাকে আটকানোর নাই। কিন্তু টাকা কি দিলেন না দিলেন সেটা দেখার লোকের অভাব নাই। এখানে ক্যামন সময় লাগে তা খরচ এর হিসাব দিলে বোঝা যাবে। আমি খরচ এর হিসাব টা দেই।

    ইমিগ্রেশন অফিস এর গেট দিয়ে ঢুকলে দুইতলা বিল্ডিং, ভেতরে ঢুকলে দুই পাশে এরাইভাল আর ডিপারচার কাউন্টার, কিন্তু আপনি যদি ট্রাভেল ট্যাক্স দিয়ে না আসেন, তাহলে আপনাকে আরো ভেতরে সোনালী ব্যাংক এর বুথ এ যেতে হবে, পার পার্সন মাত্র ১০ টাকা করে বেশী নেবে

        এবার দেবেন পোর্ট ট্যাক্স, সেটা আরেক রূম এ , ৪২ টাকার ট্যাক্স দেবেন ৫০ টাকা

·         এবার ডিপারচার এর জন্যে নাম এন্ট্রি করাতে যাবেন, আপনার এমবার্কেশন ফর্ম তারা ফিলাপ করে দেবে, আপনি চাইলেও নিজে করতে পারবেন না, নিজে করে নিয়ে গেলেও সেটা এক্সেপ্টেড হবে না, জাস্ট ১০০ টাকা সম্মানীর বিনিময়ে তারা এই এম্বার্কেশন ফর্ম টা ফিলাপ করে দেবে। লোকজন এর ব্যাবহার বেশ ভালো।

 ইমিগ্রেশন এ কিছুই জিজ্ঞেস করলো না, এমন কি আমার NOC ও চাইলো না।

শেষ করে বের হতে যাচ্ছি, ঐ সময় একজন গার্ড বল্লো স্যার আপনাদের কাস্টমস টা হয় নাই, ঐ পেছনের রূম এ যান। আমার DSLR টা পাস্পোর্ট এ এন্ট্রি করালো। চার জন পরে ৩০০ টাকা সম্মানী দিয়ে বের হইছি।

·         ইন্ডিয়া পার্ট এ ও সেম প্রবলেম। ল্যাথারজি। কিন্তু সেটা সময় এর। আপনি ঘুমাবেন, সব কাজ যেনো এই দুই পোর্ট এ অফিসার রাই করে দিচ্ছেন, আপনি জাস্ট সম্মানী দিয়ে যাবেন, আপনার কাজ করে দেবে দুই পোর্ট এর অফিসার রাই।

যাই হোক ১০.৪৫ নাগাদ দুই পোর্ট এর কাজ শেষ করে আমরা টাকা ভাঙ্গালাম, রেট এখানে খুব খারাপ। ৮১ করে পেয়েছিলাম বাংলা টাকা, আর ডলার নিলে তো পুরাই ধরা। (সরকার আপনাকে যতটুকু এলাউ করে তার বেশী আন-এন্ডর্সড মুদ্রা বহন করবেন না 😉 )

এবার, ফুলবাড়ি বর্ডার থেকে অনেক অটো পাবেন শিলিগুড়ি যাবার। আমরা একটা টাটা সুমো এর সাথে দরদাম করতে গেলে অটোচালক রা তেড়ে আসলো, তাই পরে বাধ্য হয়েই অটো তে টুকটুক করতে করতে ৩০ মিনিটের মাথায় শিলিগুড়ি পৌছে গেলাম। এখানে বলে রাখি সিক্কিম এ যাবার জন্যে আপনাকে SNT বা র‍্যাংপো চেকপোস্ট এ আপনার পাস্পোর্ট এন্ট্রী করাতে হবে।

আমরা সরাসরি FRRO Registration এর জন্যে SNT তে না যেয়ে Hotel Central Plaza তে (শ্যামলী এর কাউন্টার) চলে গেলাম। কারণ পেটে চরম ক্ষুদা, আর সেন্ট্রাল প্লাজার খাবার খুব সুস্বাদু, দাম টা একটু কড়া আর কি। খেয়ে দেয়ে ঠিক করে নিচ্ছিলাম কি করা যায়। মিতন ভায়ের সাথের দুই ভাই অপু ভাই, আর রুবেল ভাই খুব মজার মানুষ, তারা ঠাট্টা করে করে বেশ আমুদেই রাখছিলো আমাদের। অপু ভাই বল্লেন যে গ্রুপের দুইটা বাচ্চা ছেলে আসার কথা চ্যাংড়াবান্দা হয়ে, আমরা কি তাদের জন্যে ওয়েট করতে পারি ?? এখন চ্যাঙড়াবান্দার শ্যামলী বাস আসতে আসতে ১ টা বেজে যাবে। মানে তখনো প্রায় ১ ঘন্টা বাকি, ভাবলাম ওয়েট করা যেতেই পারে। আমরা ভাবলাম যেহেতু শিলিগুড়ি তেই আছি, SNT তে একবার ঢু মেরে আসি, যদিও র‍্যাংপো তে ই সব করা যায়, কিন্তু আমরা তো বসেই আছি। আমাদের এই স্বীদ্ধান্ত টা যে আমাদের কে কত বড় হেল্প করেছে, সেটা পরে বলছি। তো যেই ভাবা সেই কাজ। আমরা SNT তে গিয়ে ফর্ম ফিলাপ করে আমাদের এক কপি ছবি আর পাস্পোর্ট ভিসার এক কপি ফটোকপি করে তাদের কাছে জমা দিলাম, তারা একটা ফর্ম ফিলাপ করতে দিলো, ৪ – ৫মিনিট এ ফর্ম ফিলাপ হয়ে গেলো। তারা আমাদের চার জনের নামে আলাদা একটা পার্মিশন দিয়ে দিলো। সব মিলিয়ে ১০ – ১৫ মিনিট। এবার খোজ নিয়ে জানলাম চ্যাংড়াবান্ধার বাস আসতে নাকি আজকে লেট হবে। ভাবলাম আমরা রওনা হয়ে যাই, ঐ দুইজন পরে আসুক। SK লেখা একটা টাটাসুমো আমরা ঠিক করলাম ২৬০০ রূপি তে, ঐ দিন গাড়ীর একটু সংকট ছিলো, তাই খরচ পড়লো বেশী। আমরা যাত্রা শুরু করতে করতে বেজে গেলো বিকাল ৩.৪৫, তখনো ঐ দুই বান্দা শিলিগুড়ি পৌছাতে পারেন নাই শ্যামলী তে করে। আমরা রওনা হইয়ে গেলাম।

 

শিলিগুড়ি থেকে আমাদের টাটা সুমো ২০ মিনিট শহুরে কোলাহল পার করার পর শালগুড়া তে আসার পর থেকেই আমার সেই পাহাড় প্রেম টা যেনো আবার জেগে উঠলো। এই যে গত রাত থেকে এত্তো এত্তো ঝক্কি ঝামেলা সব আস্তে আস্তে উবে যেতে থাকলো। শালগুড়া পার হবার পর সেভক মোড় এর পর থেকে শুধু ঝিঝি পোকার আওয়াজ, আর কিচ্ছু না। মাঝখানে তিস্তা নদীর ধারে আমাদের ড্রাইভার ১০ মিনিট এর একটা ব্রেক দিলেন তিস্তা কে দেখার জন্যে। আহা, কি সবুজ টলটলে পানি।

আমরা NH10 ধরে তিস্তা, তিস্তা বাজার পার হয়ে প্রায় ১ ঘন্টা কি ১.৩০ ঘন্টা পরে গিয়ে র‍্যাংপো তে গিয়ে পৌছালাম। র‍্যাংপো ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একটা International Border ছিলো। ভারত আর সিক্কিম এর বর্ডার চেকপোস্ট এটা। কিন্তু এখন যেহেতু এটা ভারতের ই অংশ, তাই এখানে জাস্ট ফরেনার দের রেজিস্ট্রেশন হয়, আর কিছু না।

 

যাই হোক, SNT এর কথা বলছিলাম, র‍্যাংপো তে FRRO Office এর দুই তলায় আপনার রেজিস্ট্রেশন হবে তো, গিয়ে আমাদের চোখ ছানাবড়া, দুই তলার অফিস থেকে লাইন বের হয়ে ওপরে চার তলা পর্যন্ত পৌছে গেছে। ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও দেখি লাইন আর আগায় না। এখন আমার হাতে তো SNT থেকে নেয়া পার্মিশন এর কপি, এটা দেখে এক ভাই বললো আপনারা এখানে দাঁড়ায় আছেন ক্যান, আপনাদের তো পার্মিশন হয়েই গেছে, আপনি সোজা অফিসে ঢুকে যান, জাস্ট পাস্পোর্ট এ সীল নিয়ে আসেন, আপনার লাইন লাগবে না। অফিসে ঢোকার মুখে জনতা খুব চিল্লাচিল্লি, “ক্যান আগে যাইবেন, আমরা দাড়ায়া আছি” , তো ভেতরের অফিসার বল্লেন উনি আগেই আসবেন, উনার পার্মিশন হয়ে গেছে, উনি জাস্ট সীল নেবেন। বাহ, সব মিলায়ে ২০ মিনিটে র‍্যাংপো খতম।

তো যারা যারা আপনাদের কে মাসিহা দ্যান যে SNT তে যাবার দরকার নাই, সব র‍্যাংপো তেই হয়, তারা ভূল বলেন না, কিন্তু তাতে প্রবলেম টা কেউ বলে না। সামনে ট্যুরিস্ট সিজন, র‍্যাংপো তে ভীড় হবেই, সেন্ট্রাল প্লাজা থেকে মাত্র ১০ মিনিট এর রাস্তা এসএনটি, আর সিক্কিম যাবার জন্যে সস্তায় টাটাসুমো ও পাবেন এসএনটি তেই, তাহলে ১০ – ১৫ মিনিট সময় এখানে দেন, হয়তো আপনার ২ – ৩ ঘন্টা সময় বেচে যাবে রাংপো তে। র‍্যংপো তে কাজ হয়ে গেলে আপনি আর মাত্র ৪০ কিলো দূরে আছেন গ্যাংটক থেকে। কিন্তু এই ৪০ কিলো যেতে আমাদের ক্যানো জানি পুরা ২.৩০ ঘন্টা লেগে গেলো, ড্রাইভার সাহেব তো আস্তে চালালেন ই, সামনে এক রাজনৈতিক নেতার বহর পড়লো (সে সময় নির্বাচন টা মাত্র আগের দিন শেষ হয়েছে), হঠাৎ কুয়াশা ঢেকে দিলো, তো সব মিলায়ে গ্যাংটক এ পৌছালাম রাত ৮ টা নাগাদ। সবাই ক্লান্ত, কোনো রকমে চার জন এক রুমে থাকা যাবে এমন একটা হোটেল পেয়ে গেলাম আমরা ৪ জন এক রূম ১৬০০ রূপী, নাম মাজং রেসিডেন্সী, একদম MG Marg এই। নেতাজীর মূর্তির একদম সাথে। সকাল বেলা রূম থেকে কাঞ্চঞ্জঙ্ঘা দেখা যায় আবার, শুধু সমস্যা একটাই, হোটেল এর ম্যানেজার কোলকাতার , তাই সে পাহাড়িদের মতন সহজ সরল না, সব কিছু তেই আমাদের সাথে ধান্ধাবাজী করতে চেষ্টা করলো। উনি আমাদের কে লাচুং-ইয়াম্থাম প্যাকেজ ধরায় দিতে চাইছিল অনেক দাম দিয়ে, আমরা নিলাম না। কিন্তু বের হয়ে দেখলাম সব বন্ধ। রুবেল ভাই বললো “যা থাকে কপালে, কালকে সকাল ৬ টা থিকা মিশন শুরু করমু, কালকেই যামু লাচুং”। আমরা ইনশাল্লাহ বইলা ঘুমাইতে গেলাম। খানা খাইদ্দ্যো বলতে এক মুসলিম হোটেল এর জঘন্য মোরগ বিরিয়ানি। যাক ঘুম দিলাম। ফি আমানিল্লাহ। তাপমাত্রা তখনো বেশ ওয়ার্ম আর কি, খুব কম হইলে ১৪ – ১৫। রাতে একবার ঘুম ভাঙ্গে, কে যেনো খুব জোড়ে টয়লেট এর দরজা লাগালো, খুব জোড়েই আওয়াজ হলো, আমি জেগে দেখি বাকিরা ঘুমায়, তার মানে আমাদের কেউ না। আমি ঘাপটি মেরে পরে থাকি, আওয়াজ হয় না। একটু পর আবার ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ করে দরজা হালকা খুলে, আবার লেগেও গেলো সাথে সাথে। আমি পরে থাকি চুপচাপ, কিছু বলি না।

 

দিন -২ রাত ৩ (১৩ই এপ্রিল)

সকাল বেলা ৫.৩০ এ সবাইকে ডাইকা তুল্লাম, কাওকে রাতের ঘটনা বল্লাম না, অযথা ভূতের ভয় পাবে। ৬ টা নাগাদ বের হয়ে কয়েক টা এজেন্সি খোলা পেলাম, কিন্তু কেউ রাজী হয় না আজকে লাচুং এর জন্যে। বল্লাম তাইলে সাংগু যাই, তারা বল্লো, সকালে আগে সাংগুর পার্মিশন দেয়, তারপর লাচুং। সাংগু তো আজকে চিন্তাই করা যাবে না। এইবার আমরা অন্য পথ ধরলাম। এজেন্সি বাদ দিয়া আমরা গেলাম ট্যুরিজম অফিসের সামনে যেখানে ড্রাইভার রা পার্মিশন এর জন্যে লাইন ধরছে সেখানে। কয়েকজন ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলাম সম্ভব কি না, তারা বলে আজকে সিটি ট্যুর দেন, কালকে যায়েন। হঠাৎ এক ড্রাইভার বললো, আপনারা কি ধইরাই নিসেন যে আজকেই আপনাদের যাইতে হবে লাচুং ? আমরা বল্লাম সময় কম আমাদের, আজকে না যাইতে পারলে শেষ আমরা। উনি বললেন সোনাম দাদার কাছে যান। লর্ড ট্রাভেলস, উনারা যেইখানে লাইন ধরছে ঠিক তার উপরেই এজেন্সি টা। গেলাম তার কাছে, তিনি কিছুক্ষন আমাদের অসহায় চেহারার দিকে তাকায়া একটা মিস্টি হাসি দিয়া বল্লেন পাস্পোর্ট, ভিসা আর ছবির ৩ কপি করে দেন, আমি চেষ্টা করি। উনি একবার এরে ফোন করে তো আরেকবার তারে ফোন করে, মাঝে একবার নিজে চলে গেলেন ট্যুরিজম অফিসে, এসে বল্লেন, তাড়াতাড়ি দ্যান, আপনারা আজকেই যাইবেন, এর মাঝে আবার ঐ চ্যাংড়াবান্দার দুই বান্দা ও চলে আসলেন, বল্লাম আমাদের আরো ঝামেলা আছে , আমাদের পার্মিশন সবার এক সাথে না, পার্মিশন ৪ জনের এক্টায়, দুই জনের একটায়, হবে ? উনি বল্লেন সমস্যা না, আমি কইরা দিবো। উনি আমাদের কে ১৩৫০০ রূপি চার্জ করলেন, দরদাম করতে চাইছিলাম, বাট হাত ছাড়া হয়ে যাবে দেখে রাজী হয়ে গেলাম, টাটা সুমো তে দেবে, জাইলো ও না।

 

৯ টা নাগাদ আমাদের পার্মিশন হয়ে গেলো। কার জন্যে কোথায় দেরি হইছে বলবো না, ঐ সময় বিরক্ত লাগলেও পরে খুব মজা করছি এই দেরি করা নিয়া, আমাদের স্টার্ট করতে করতে ১০.৪৫ বেজে গেলো। আমি আগেই বলছি আমি সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারি না। কিন্তু আমাদের অবাক হবার পালা শুরু হইলো। গ্যাংটক শহর টা দার্জিলিং এর মত না। অনেক ছিমছাম, অনেকে বলে স্কটল্যান্ড এর মত। আমি স্কটল্যান্ড যাই নি। তবে শুধু শহর এর কথা বললে গ্যাংটক এর চাইতে দার্জিলিং আমার কাছে অনেক বেশী হ্যাপেনিং একটা শহর মনে হইছে। আমাদের টাটা সুমো শহরে আসবে না। আমাদের কে শহর থেকে একটু দূরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে উঠতে হবে। ১৫০ রূপি ভাড়াতে আমরা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এ পৌছাই।  

আমাদের ড্রাইভার উমেশ দাদা, হাসিখুশি আর মজার মানুষ। যাত্রা শুরু হলো, কাঞ্ছন কে বামে ফেলে আমরা শহর থেকে বের হলাম। পথে কম করে হইলেও কয়েকশ ছোটো বড় ঝড়না। রাস্তা যে সব জায়গায় মসৃন তাও না, মাঝে মাঝে বেশ বিপদজনক ঢাল, উৎরাই, আর কিছু কিছু জায়গায় বর্ষার ঢলে ব্রীজ, রাস্তা ভেঙ্গে খাদে পড়ে আছে। গাড়ীর একদম গা ঘেষে সবুজ খাদ, দূড়ে সাদা মেঘ এর পাহাড়। এই সব দেখতে দেখতে দুইটা নাগাদ আমরা পৌছালাম সংকলং এর একটু আগে একটা জায়গায় লাঞ্ছ এর জন্যে। দেখলাম মোটামোটি সব এজেন্সীর গাড়ি এখানেই থামে খাবারের জন্যে। খাবার হিসেবে ডীম ভূনা, ডাল, কচি বাসের ঝোল করা সবজি আর বাসী কুমড়া। কুমড়া টা বাদে বাকিগুলা আমরা গপাগপ গিলে খাচ্ছিলাম। পথে ভেওমা ফলস, আরো কিছু চু আর ঝিড়ি পার হয়ে আমরা যখন লাচুং এর কাছাকাছি তখন বেশ ঝুম বৃষ্টি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বৃষ্টি যত বাড়ে ঠান্ডা তত বাড়ে। এর বৃষ্টির ফাক গলে দূড়ে মেঘের মত না কিন্তু সাদা সাদা চূড়া দেখা যায়। আমরা মেঘ ভেবে ভূল করি, আর উমেশ দা বলে ঐ তো বরফ দেখো। হঠাৎ করে গ্যাংটক এর ১৪ – ১৫ থেকে লাচুং এ প্রায় ১ডিগ্রী। প্যাকেজ এর আওতায় আমাদের ছয়জন কে দুই রূম এ দেয়া হলো, আমাদের রূম থেকে কি একটা পাহাড় দেখা যাচ্ছ পুরো বরফ এ ছেয়ে আছে। সে এক অপার্থিব দৃশ্য। এতো বৃষ্টির মধ্যেও খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বরফ এ মোড়া নীল পাহাড়। আমরা ভাভারেভাভা বলে হা করে তাকায় থাকি। রাতে পাহাড়ী মোরগ, ডাল আর আচার দিয়ে ভাত খেতে যাবার আগ পর্যন্ত আমরা তাকায় থাকি ঐদিকেই।

আমাদের ড্রাইভার উমেশ দাদা, হেব্বি স্মার্ট, আর ফানি এই লোক টা এসে বললো হা করে তাকায় না থাইকা ঐটা যদি সামনে থিকা দেখতে চাও তো আমাকে ৩০০০ টাকা দাও, আমি নিয়ে যাবো, ঐটা কাটাও এর রাস্তায় পড়ে। আমরা রাজী হয়ে যাই।

 

দিন – ৩ রাত ৪ (১৪ই এপ্রিল – পহেলা বৈশাখ)

 

আমরা সকাল এ ৫.৩০ এ ঊঠে আবার পাহাড়ের দিকে হা করে তাকায় থাকি। পহেলা বৈশাখ টা খুব মিস করতেছিলাম, এই প্রথম পহেলা বৈশাখ এ ঢাকা তে নাই আমি। কালকে রাতে লাচুং গ্রাম টা দেখা হয় নাই। রাতের বৃষ্টি আর ঝরের পর গ্রাম টা আরো বেশী ফ্রেস। এর মাঝে হোটেল এর বয় এসে জানালো কালকে রাত থেকে বৃষ্টির কারণে পানি বন্ধ ছিলো, তাই সকালে সে পাহাড়ে গেছিলো পানি আনার জন্যে, সেখানে না কি আজ খুব বরফ জমেছে। তার মানে আমাদের লাক ভালো। আমরা চা খেয়ে রওনা হই কাটাও এর দিকে। লাচুং কে পাশে রেখে আমরা স্বর্গের সিড়ি দিয়ে উঠতে থাকি। গ্রাম থেকে ৫ মিনিট ও হয় নাই বের হইছি, তাতেই আমাদের চারপাশ এ বরফ এর আপ্যায়ন দেখতে থাকি। যত ঊঠতে থাকি, পাহাড় তত সাদা হতে থাকে। একটা সময় আমরা পৌছে যাই কাটাও এর একটা পয়েন্ট এ, এর উপরে আর যেতে দেয়া হয় না। এর পর টা পুরোটাই আর্মি দের ব্যারাক। আমরা তো ঐ অতটুকু দেকেই হা হয়ে থাকি। বরফ ধরি, আমি ছবি তোলার চেষ্টা করি, মিতন বরফ এ স্কেট করতে চেষ্টা করে। আমরা যেনো বাচ্চা হয়ে যাই। কিছুক্ষন পর ড্রাইভার তাড়া দিলে আমিও ওদের কে তাড়া দিতে থাকি, পারলে আমাকে মারতে আসে সবাই। আমিও ভয় পাবার ভান করে থেকে যাই, ড্রাইভার কে বলি উমেশ এখন আমি আবার যেতে বলার তাড়া দিলে আমাকে মারবে, তুমি গাড়িতে বসো, আমি কিছুক্ষন পর নিয়ে আসি। আমরা কাটাও থেকেই সোজা চলে যাই ইয়ুমথাং ভ্যালির দিকে, কিন্তু কাটাও এর সাদা বরফ আর চারপাশের মেসমেরাইজিং ভিউ এর পর ইয়ুম্থাং টা আমার কাছে খুব সাদামাটা লাগলো। উমেশ বললো ঠিক ই আছে, এইটা সাদামাটাই এখন, তোমরা ইয়ুম্থাং এ ক্যান শীতে আসো আমি বুঝি না, ইয়ুম্থাং মানে আমাদের কাছে ফুলের ভ্যালি। আর এক দুই মাস পর এখানে ৩২ রং এর ফুল ফুটবে। তখন দেখবা এইটার রং, আমি বলি আসব তাইলে আগামী বছর। যাই হোক শুকনা রূটি আর জ্যাম খাই ঐখানে দাড়ায়ে দাড়ায়ে। কিন্তু হট অয়াটার স্পিং বলে একটা যায়গা আছে ঐটা আমরা মিস করে যাই। জায়গা টা না কি খুব সুন্দর।

১ টা নাগাদ হোটেল এ ফি্রে আবার ডীম, ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে গ্যাংটক এ ফেরৎ আসি ৬ টা নাগাদ। আমাদের কাছ থেকে লাচুং এর প্যাকেজ এ একটু বেশী টাকা নিয়েছে মনে হলেও আমরা আবার সোনাম এর কাছে যাই পরদিন সাঙ্গু যাবার জন্যে। তিনি আমাদের কে লাক্সারিয়াস এবং নতুন ইনোভা গাড়িতে পরদিনের প্যাকেজ দেন গাইড সহ ৫০০০ রূপি তে। আমরা এখানে আবার তিন কপি করে সব ডকুমেন্ট দেই। এবার আমার থুপকা খাবার পালা। আমি থুপকা খুজে পাই এক দোকানে। বাকী রা রোল, মোমো, আর নুডুলস নেন। আজকে আবার ঘুম সেই মাজং এর ঐ ছাদের ওপরের রূম টাতে। যেখানে ভূতে টয়লেট এর দরজা টানাটানি করে। আমি ঊঠতে চাই নাই, কিন্তু বাকী রা ঊঠে গেলো। আমি এই বার বইলা বসলাম ভূতের ঘটনা। সবাই কয় হুর মিয়া ঘুমান।

 

দিন – ৪ রাত ৫ (১৫ই এপ্রিল)

 

সকাল বেলা রুবেল ভাই বললো কালকে রাতে সেও টের পাইছে, কে জানি টয়লেট এর দরজা ধরাম কইরা আটকায়া দিসে, আর টয়লেট এর বাতি জ্বালাইছে। আমি ডর এ ডর এ গোসল এ যাই। দরজা টা খোলা রাইখা দাত মাজি আর শ্যাভ করি, এমন সময় মনে হইলো কে জানি ঠান্ডা একটা বাতাস আমার গায়ে মারলো আর দরজা টাও টাইনা আটকায়া দিতে চাইতেছে। তবে রে ব্যাটা !!! ভূত টা আমি খুজে পাই। এক চটকানা দিয়ে ভূত তাড়ানোর চেষ্টা করি , কিন্তু বাতাসের গায়ে চড় কিভাবে মারবেন ?? টয়লেট এর জানালা হলো আমাদের বাসাবাড়ীর জানালার মতন, বেশ বড়। যেইটা আমরা খোলা রাখছিলাম, সেইটা দিয়া পাহাড়ী বাতাস বেশ জোড়েই ঢোকে। আর ঐ বাতাসের দরজা একবার বাড়ী খেয়ে লাগে আবার খোলে। আর আগের রাতে আমাদের ই কেউ টয়লেট এর বাতি জ্বালায়া ঘুমাইছিলো।

 

এবার পালা সাঙ্গু দেখার। ইনোভা গাড়ী বেশ কম্ফোর্টেবল। ছয় জন বেশ আরামে আমরা ঘুড়ে আসলাম। গ্যাংটক এর ৬৫০০ ফিট থেকে আমরা পাহাড়ী আকাবাকা সরু রাস্তা ধরে প্রায় ১.৩০ – ২ ঘন্টা কেবল উপরেই ঊঠতে থাকলাম। রাস্তার মোরে মোরে কিছু উপদেশ বাণী –

Be Gentle BRO, The View is beautiful not the Death.

Have you ever wondered who made these roads where it is almost unbearable to live; it is the BROs, Be Respectful to them and Drive Slow.

 

সাঙ্গু তে পৌছানোর কিছু আগে আমরা একটা দোকানে থেমে যার যার মোটা গরম কাপড় লাগবে ভাড়া করে নিয়ে গেলাম, মোজা, হাত মোজা, জ্যাকেট সব ই আছে এখানে। আমরা তৈরী হয়ে সাংগুতে যখন পৌছালাম চারপাশ তখন একদম মেঘে ঢেকে আছে। কিছু তেমন দেখা যাচ্ছে না। আমার খুব হতাশ লাগা শুরু হলো। লেক টা একদম ই বুঝা যাচ্ছে না। ক্যামেরা টা আমি বন্ধ করে রেখে দৌড়ে ঊঠার চেষ্টা করলাম, আর এখানেই বাধলো বিপত্তি। ভূলে গেছিলাম এইটা ১২৭০০ ফিট। আমার চোখ হালকা অন্ধকার হয়ে আসতে লাগলো,আর দম ও বন্ধ হতে লাগলো। আমি বরফের উপরে কিছুক্ষন বসে রইলাম, এবং আশ্চর্যজনক ভাবে কিছুক্ষনের ভেতর আবার সব ঠিক ও হয়ে গেলো। আমরা ঠিক বাচ্চাদের মত বরফ ছোড়াছুড়ি করতে লাগলাম। যেহেতু ক্যামেরায় কিছু উঠবে না, তাই ছবি তোলার কোনো তাড়া নাই, আমরা জাস্ট বরফ টা এনজয় করতে লাগলাম, ফেরার পালা হয়ে এলো খুব তাড়াতাড়ি। গ্যাংটক শহর টাই তো দেখা হয় নাই এখনো, শহরটার জন্যে এখনো প্রেম জাগাতে পারি নাই, এখন ১২ টা বাজে, ২ টা নাগাদ পৌছে যাওয়া যাবে, আজকে আমরা হেটে হেটে শহর দেখবো।

 

কিন্তু আমি চাইলে হবে, আল্লাহ চাইলেন না। নামার পথে চেকপোষ্ট এর কিছু আগে কোনো একটা গাড়ী দুর্ঘটনায় পড়েছে, রাস্তা বন্ধ। ঐ গাড়ি না সরানো পর্যন্ত গাড়ি আগাবে না। পুরো ২ – ২.৩০ ঘন্টা আমরা জাস্ট একটা সরু রাস্তায় আটকে রইলাম। গ্যাংটক এ যখন পৌছালাম তখন বিকেল ৬.৩০ টা, কারণ পুরো রাস্তা জ্যাম হয়ে গেছে। মন খারাপ হয়ে গেলো, এই শহরে আবার আসতে হলে ও শহরটার সাথে বন্ধুত্ত্ব করতে হবে। হলো না। আমরা এম জি মার্গ এ হালকা হাটাহাটি করি, বীগবাজার খুজে বের করি। কিছুই কেনা হয় না। অফিসের লোকজনের জন্যে চকলেট কেনা দরকার, তা ও পাই না। পরদিন ফেরৎ আসবো, খুব সকাল সকাল ফেরৎ আসতে চাই, যদি শিলিগুড়ি তে কিছু কেনাকাটা করা যায় এই আশায়। একটা গাড়ি পাই আমদের কে সকাল ৬ টায় পিক করবে, আমাদের সিক্কিম ট্যুর শেষ হবে ভাবতেই মন টা খারাপ হয়।

 

দিন – ৫ রাত ৬ (১৬ই এপ্রিল)

 

সকাল ৬ টায় আমরা গাড়িতে উঠে বসি, জাইলো গাড়ি, খুব ই কম্ফোর্টেবল, গ্যাংটক এ আসার দিনের অভিজ্ঞতায় আমরা ধরে নেই র‍্যাংপো পৌছাতে আমাদের হয়তো ৮ টা ৮.৩০ টা বাজবে, কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে ঠিক ৭.১৫ তে আমরা র‍্যাংপো পৌছাই, আমরা গাইগুই করতে থাকি ড্রাইভার এর সাথে যে আমাদের কে এখানে ছেড়ে দাও, আমরা এক্সিট সীল নিয়ে তারপর ফিরবো। ড্রাইভার আমাদের কে আশ্বস্ত করে বললো তোমাকে যে অফিসেই আসতে হবে এমন কথা নাই, রাস্তার উলটো পাশে দেখো চেকপোষ্ট, ঐখানেও অফিসার আছে। ঐখান থেকো এক্সি্ট নিতে পারবে। আমি সন্দেহ নিয়ে চেকপোষ্ট এর অফিসে ঢুকি, দেখি আমাদের মতন আরো কয়েকজন, তারা অন্য দেশী ঐখানে তাদের পার্মিশন এর কপি জমা দিয়ে পাস্পোর্ট এ এন্ট্রি সীল এর ভেতরে জাস্ট ডীপারচার এর ডেট লিখায়ে নিচ্ছে। আমরা আশ্বস্ত হই। ফেরৎ আসি শিলিগুড়ি ৯ টা নাগাদ। গ্যাংটক যাবার সময় আমরা অনেক কিছু মিস করে গেছিলাম, এবার অনেক কিছু চোখে পড়লো – পাহাড়ের বাকে বাকে গাড়ীর ড্রাইভার দের জন্যে কিছু দারূন দারূন কথা লেখা –

 

1. Be gentle on my Curves Baby

2. This is Valley not a Rally

3. Death is not only Costly for US, it is costly for you and your family too

 

এখানে সকালের নাস্তা করে আমরা বিধান মার্কেট যাই। অযথা বেশ কিছুটা সময় নষ্ট করে একদম কিছু না কিনেই আমরা আবার আগের সিস্টেম এ বর্ডার এ আসি ৩.৩০ টা নাগাদ। দুই পাশে খরচ এবং প্রসিডিউর আবার ও সেম, এবং আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এখানে ফেরৎ আসার সময় ও পোর্ট ট্যাক্স নিচ্ছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেছে এইটা এই পোর্ট এর নিয়ম। চেকিং খুব ই কম। কিছুই হয় না বল্লেই হয়।

 

আ্মাদের ঢাকা ফেরার পালা। আমাদের বাহন আবার ও ট্রেন, রাত ৯ টায়, আমরা এবার লোকাল বাসে পঞ্ছগড় ফিরি। ৭ টা নাগাদ পৌছাই। নীরব হোটেল এ ভরপেট খেয়ে আমরা স্টেশন এ চলে আসি, এখানে ওয়েটিং রূম টা বেশ গোছানো, টয়লেট ও পরিষ্কার। ট্রেন যথারীতি ৯ টায় ছেড়ে গেলো। পরদিন সকাল ৯.৩০ নাগাদ আমরা যে যার বাসায়।   

 

এবার আসি খরচের হিসাব –

ট্রেন এ যাবার বেলা পার পার্সন স্নিগ্ধা – ১০০০ টাকা

মাইক্রো ভাড়া – ১২০০ টাকা

দুই বর্ডার এ স্পীড মানি পার পার্সন – ৪৫০ টাকা

ট্রাভেল ট্যাক্স আর পোর্ট ট্যাক্স – ৬০০ + ১০ টাকা

শিলিগুড়ি টোটো তে – ২৫০ রূপি (পার পার্সন পরলো – ৬৩ রূপি ৪ জন)

শিলিগুড়ি টু গ্যাংটক টাটা সুমো – ২৭০০ রূপি (পার পার্সন পরলো – ৪৫০ রূপি ৬ জন, পথে দুইজন নিয়ে নিসিলাম)

হোটেল ভাড়া – ১৬০০ রূপি এক রাত (পার পার্সন পরলো – ৪০০ রূপি ৪ জন)

লাচুং ইয়ুম্থাং প্যাকেজ – ১৩৫০০ রূপি (পার পার্সন পরলো – ২২৫০ রূপি ৬ জন) খাবার সহ সব

সাঙ্গু প্যাকেজ – ৫০০০ রূপি (পার পার্সন পরলো – ৮৩৪ রূপি ৬ জন)

বাকী দুই দিনের হোটেল ভাড়া – ৩২০০ রূপি (পার পার্সন পরলো – ৮০০ রূপি ৪ জন)

গ্যাংটক টু শিলিগুড়ি – ৩২০০ রূপি (পার পার্সন পরলো – ৫৪০ রূপি ৬ জন) – বেশী, কারণ জাইলো গাড়ী ছিলো

বর্ডার এ আবার পার পার্সন – ৪৫০ + পোর্ট ট্যাক্স ৫০

বাংলাবান্ধা টু পঞ্চগড় – ৭০ টাকা পার পার্সন

ট্রেন ভাড়া ঢাকা পর্যন্ত – ১০০০ টাকা

 

শেষ পর্যন্ত খাবার দাবার সহ সব মিলিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে একেক জন এর ৯,৫০০ টাকায় শেষ।

 

সিক্কিম এ এয়ারটল বা ভোডাফোন যে কোনো সিম নিয়ে যান, বিন্দাস নেটোয়ার্ক পাবেন। কিছু কিছু জায়গায় ভোডাফোন এর চাইতে এয়ারটেল ভালো কাজ করেছে, আবার কিছু জায়গায় ভোডাফোন। আর সাঙ্গু যাবার পথে গ্যাংটক থেকে বের হয়ে ১৫ – ২০ মিনিট যাবার পর কোনো সিমের ই নেটওয়ার্ক নাই। কোনো সিমের ই না। আর সাঙ্গু, কাটাও, ইয়ুম্থাং এসব এলাকায় ও সেম অবস্থা, কোনো সীমের ই নেটওয়ার্ক নাই। তাই এয়ারটেল ভালো না, ভোডাফোন ভালো এই সব ঝগড়াঝাটির দরকার নাই। যে কোনো টা নিয়ে যান, শুধু ইন্টারনেট এ এক্সেস চাইলে অনেক সময় দেখা যায় যে পাওয়া যায় না, তখন মোবাইলে সেটিংস এ যেয়ে ডাটা রোমিং টা অন করে নিয়েন, ভালো সুবিধা পাবেন।  

 

সিক্কিম খুব ই পরিষ্কার একটা এলাকা। সেখানে অনেক জায়গায় প্লাস্টিক ও ব্যবহার করা হয় না, পানির বোতল ও নিতে দেয়া হয় না। আর আমরা বাংলাদেশী রা মাত্র যাওয়া শুরু করলাম। তাই চেষ্টা ছিলো যত টা সম্ভব সেখানে নোংড়া না করার, এমন কি কেউ আমরা থুথু ও ফেলি নাই। চেষ্টা করবেন পরিবেশ নোংড়া না করতে। আর আমরা সবার সাথে এতোটাই ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি যে লাচুং ট্যুর এর আমাদের যিনি ড্রাইভার ছিলেন উমেশ দাদা, উনি গ্যাংটক এ এসে আমাদের কে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বাংলাদেশীদের নিয়ে তার ধারণা টা আমরা চেঞ্জ করে দিসিলাম।

  • : আমার সিক্কিম ডায়েরি (My Sikkim Days)
  • :
  • : Sikkim
  • : car_(hire)
  • : 13500
  • : 2500
  • : 6000

0 comments

Leave a comment

Login To Comment