Image

দেবতা পাহাড়ের গান

বিস্বাদ-চিহ্ন মাখা শহরের ইট দালান, দাঁতচাপা ব্যস্ততা, ঘড়ির কাঁটায় চলা জীবনের হিসেবগুলো না হয় দায়িত্বের খাতায় থাকুক না; সেই সাথে হিমশীতল পানির টলটলা ঝর্ণা, পাহাড়ের গা ঘেঁষে ধুলো-কাদার মোজায় মোড়ানো পা— এগুলো নিজের আত্মকথনের নোটবুকটায় তুলে রাখা যাক। এসব আত্মমগ্ন মেলানকোলি থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তাতেই ছুটে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের বুকে এক ফালি স্বর্গ যাকে বলা যায়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পসরা মেলে ধরা অদ্ভুত রূপসী বান্দরবানের গহীনে। ঢাকা থেকে রাতের যাত্রায় মোটামুটি ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলাম বলা যায়। সকালের মিষ্টি রোদ মেখে যখন বান্দরবান শহরে নামি তারপর থেকেই শুধু যেন স্বর্গপানে এগিয়ে চলা। থানচি থেকে নৌকা নিয়ে খুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতে যেতে পাহাড়ের বুক চিরে কলকল শব্দে বয়ে চলা সাঙ্গু নদীর সঙ্গী হয়ে আসল সফরনামা যেন শুরু হলো। সেই সাঙ্গু নদী ধরে যেতে যেতেই দেখা মিললো বড়পাথর এবং রাজাপাথর যা কিনা স্থানীয় প্রৌঢ়দের কাছ থেকে শোনা যায় তাঁরা বেশ মান্য করে চলেন। এরপর তিন্দু অতিক্রম করে শীতের নরম রোদ গায়ে মাখতে মাখতে পৌঁছে গেলাম রেমাক্রি ফলসে। যেখান থেকে আমাদের ৪/৫ ঘণ্টার অ্যাডভেঞ্চারাস ট্রেকিং শুরু হবে। দু’পাশের পাহাড় ছুঁয়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা রেমাক্রি খালের শীতল পানিতে পা ভিজিয়ে চলতে চলতে আপনার মনে হবে যে, আশেপাশের বিস্ময়কর মুগ্ধতায় ঘেরা প্রকৃতিই যেন আপনাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চোখজুড়ানো যেই ত্রিমাত্রিক জগতের ঘোরলাগা মাদকতায় অনুভূতি প্রকাশে আপনি ভাষা খুঁজে পাবেন না। এই হাঁটাপথেই দেখা মিললো খুম পরিবারের প্রথম, নাফাখুম জলপ্রপাতের। যার গর্জন আপনি বেশ অনেকটা দূর থেকে শুনতে পাবেন। কাঁচের মতো স্বচ্ছ জল অবিরাম ঝাঁপিয়ে পড়ছে পাহাড়ের উপর থেকে। যেখানে আপনি মুগ্ধ হতে বাধ্য।

নাফাখুমে বেশ কিছু সময় মুগ্ধবোধে কাটিয়ে আরো কিছুটা হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে গেলাম জিন্নাপাড়ায়। এই অতিপ্রাচীন আদিবাসী পাড়াতেই আমরা ডেরা গেঁড়ে ফেলি। এই হুট করেই উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা সাময়িক জীবনের রাত্রিযাপন হবে পাহাড়ের উপরে জিন্নাপাড়ার হেডম্যানের মাচাং ঘরে। জুমের চালের গরম ভাত, ঘন মসুর ডাল, আলুভর্তা আর  মুরগীর মাংস দিয়ে রেমাক্রি খালের পাশে বসে রাতের খাওয়াটা হলো অনবদ্য। খাওয়া পর্ব শেষে হয়তো ওই মাচাং ঘরের বারান্দায় বসে পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় ঝকঝকে আকাশের অজস্র মিটিমিটি তারার মাঝে এই গহীন অতিপ্রাকৃতিক এই জগতে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেলাম।

পাহাড়ের কনকনে শীতের মধ্যে মাচাং ঘরে ঘুমিয়ে উঠে সকাল হতেই আমাদের পরবর্তী যাত্রা শুরু। আরো কিছুটা ধুলোমাখা পথ ট্রেকিং শেষে আমরা পৌঁছে গেলাম দেবতা পাহাড়ের চূড়ায়। দেবতা পাহাড় প্রায় ৯০ ডিগ্রি সমান্তরাল। সেই ভীষণ খাড়া দেবতা পাহাড়ের গা বেয়ে পাহাড়ের তলদেশে নামতেই ঘন গাছগাছালির ফাঁকে বর্শার ফালির মতো চিরে আসা রোদের মাঝেই দেখা পাবেন এক অসীম সৌন্দর্যময় সৃষ্টি আমিয়াখুম জলপ্রপাতের। যাকে বাংলাদেশের ভূস্বর্গ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন অনেকেই। আমিয়াখুম জলপ্রপাতে শুশুকের মতো ডুব দিয়ে আদিমানবদের অস্তিত্ব জানান দিতে কারোরই এক মুহূর্ত দেরি হয়নি। এরপর ভেলাখুমের শান্ত গভীর জলে বাঁশের তৈরি প্রায় ১৫ ফিটেরও বেশি ভেলায় চড়ে ধীরে ধীরে বাইতে শুরু করলাম বৈঠা হাতে। নির্জন পাহাড়ের মাঝে অতিপ্রাকৃত এই পরিবেশের মধ্যে ভেলা বাইতে বাইতে আনমনেই অণর্বদার সাথে যেন গুনগুন করে গেয়ে উঠি “হারিয়ে গিয়েছি, এই তো জরুরী খবর!” 

ভেলাখুমের সাথেই আরো দেখা মিললো সাতভাইখুম, নাইক্ষংমুখ, মাথাভরাখুমের। সৌন্দর্যসম্ভোগে আপনি পেছনে রাখতে পারবেন না কোনোটিকেই। দুপুরের পরেই জিন্নাপাড়ায় ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে যে যার মতো কিছুক্ষণ গড়িয়ে নিলাম। সন্ধ্যার পরেই মাচাং-এর পাশের চা দোকানে বসে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতে দিতে একসময় মনে হলো ফিরে গিয়ে কী হবে? বাকি জীবনটা না হয় এখানেই কাটিয়ে দিই। মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, ইন্টারনেট নেই, নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ, নেই মানুষে-মানুষে রেষারেষি। সবকিছু সুবিশাল পাহাড়ের মতো মৌন আর জলের মতো শান্ত।

কিন্তু এই সন্ন্যাসব্রতের চিন্তা ওই খনিকেরই। জীবনের পিছুটানেই ফিরে আসতে হলো পাহাড়-নদীর মাতাল করা হাতছানি উপেক্ষা করে। জীবন তো মোটেমাটে একটাই। তাই জীবনটা হোক উড়ুক্কু ফড়িং-এর। হোক হৃদস্পর্শী গানের মতো মায়াময়; হোক আশ্চর্য কিছু চলিষ্ণু মেঘদলের মতো। না বলা গল্পের অহেতুক ভীরে ভীষণ একঘেয়ে যেন না হয়! এই ভূস্বর্গের কাছাকাছি গিয়ে দেখবেন কেউ হয়তো বাঁশির মধ্যে একটা ভীষণ কোমল সুরে টান দিয়েছে আর আপনি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন মেঘপাহাড় ও রূপালি নদীর আশ্চর্যান্বিত সন্ধিপথে।

0 comments

Leave a comment

Login To Comment