Image

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে শিব চতুর্দশীর মেলায়

যে বছর থেকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে এবং এই বিশেষ দিনটি নিয়ে মানুষের কৌতুহল ও উৎসাহের কারণ সম্পর্কে জানতে পেরেছি, তখন থেকে বিভিন্নভাবে এটি পালন করেছি- কখনও স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের নিয়ে, কখনও পরিবারের সাথে, আবার কখনও অফিস ফাঁকি দিয়ে বাড়িতে মিথ্যে বলে ছেলেবন্ধুর সাথে। এবারেও এরকমই কিছু একটা করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু মনের ভিতর কোথায় যেন একটা অসম্পূর্ণতা কাজ করছিল।

দিন সাতেক আগে জানতে পারলাম যে ঐ দিন রাতেই, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব ‘শিব চতুর্দশী’ পালিত হবে। তো ঠিক হয়ে গেল- এ বছরের ভ্যালেন্টাইন্স ডে আমি আমার এক হিন্দু বান্ধবীর সাথে সেজেগুজে মন্দিরে গিয়ে উদযাপন করব। মোটামুটি খুশিই ছিলাম। কারণ ছোটবেলা থেকেই হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবে আমি বেশ সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হলেও, মন্দিরে সেভাবে কখনই যাওয়া হয়ে উঠেনি।

কিন্তু বিধাতার পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে বেশিরভাগ সময়েই ভিন্ন আর নি:সন্দেহে আরও ভাল হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে সেই বান্ধবীর সাথে মন্দিরে যাওয়ার প্ল্যান করতে করতেই হঠাৎ ফেসবুকের জনপ্রিয় গ্রুপ ‘ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ’ এর একটি পোস্ট আমার নজর কাড়ে, যেখানে একজন ভ্রমণপ্রেমী বড় ভাই তাঁর কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে শিবচতুর্দশীর মেলায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ট্রেকিং করে চূড়োয় ওঠার গল্প শেয়ার করেন।

আমি ট্রেকিং পছন্দ করি, কিন্তু পাহাড় বেয়ে ওপরে ওঠার সাধ আমার ততটা নেই- যদিও আমি এর আগেও পাহাড়ে ট্রেকিং করেছি। আমি পছন্দ করি নতুনকে জানতে, নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে, বনে-জঙ্গলে ট্রেকিং করতে, আর্কেওলজিক্যাল সাইট বা পুরাকীর্তির জন্য বিখ্যাত জায়গায় ঘুরতে, ইতিহাস জানতে… আর, পছন্দ করি আমার দেশের ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে- পেশাদারী শব্দে যাকে বলা হয় ‘ডেস্টিনেশন মার্কেটিং’ বা ‘কান্ট্রি ব্র্যাণ্ডিং’।

এ পর্যন্ত আমর প্রায় বেশিরভাগ ভ্রমণেই একদল অপরিচিত বা স্বল্প-পরিচিত মানুষের সাথে একাই যোগ দিয়েছি- কোন আত্মীয়, বন্ধু বা পরিবারের সাথে নয়। আর প্রতিবারই অমূল্য অভিজ্ঞতার সাথে নতুন বন্ধুত্ব নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু এবারে আমার মন আরও একটু সাহসী হতে চাইল। ঠিক করলাম, এবছরের ভ্যালেন্টাইন্স ডে আমি আমার নিজের সাথেই উদযাপন করব। সেই অনুযায়ী, ১৩ ফেব্রুয়ারী পুরো জমকের সাথে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে, রাত ১১ টার বাসে একাই যাত্রা শুরু করলাম; গন্তব্য: সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম। আমার ১ম ‘সোলো ট্রিপ’ তথা একক ভ্রমণ ও দেশের ২৭ তম জেলা দর্শন।

পরদিন অর্থাৎ ১৪ তারিখ দুপুরের মধ্যেই আমার ঢাকায় ফিরে আসার প্রয়োজন ছিল। এই কারণে পুরো পথেই আমি শুধু দুশ্চিন্তা করে চলেছিলাম যে যদি কোনো কারণে সময়ের গরমিল হয়ে যায়, তাহলে কীভাবে সেটা মিলিয়ে নিব। রাস্তায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জ্যাম থাকায় আমার টেনশন আরও বাড়তে থাকল। সেই সাথে বহুক্ষণ অভুক্ত থাকায় আমার পাকস্থলীও বেশ মেজাজের সাথেই মোচড়ামুচড়ি করছিল। শেষ পর্যন্ত এল সেই মহা প্রতীক্ষিত মধ্যবিরতি এবং গরম গরম পরোটা আর মুগ ডালের ভুনা দিয়ে রাত ৩:১৫ এর দিকে সের নিলাম আমার পেটপূজা।

খাওয়া সেরে হোটেলটির আশপাশ একটু ঘুরতে বেড়িয়ে দেখলাম, একই মেলার উদ্দ্যেশ্যে শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবেই নয়, বরং ট্যুর গ্রুপের সাথেও অনেকেই যাত্রা করছে। ভালই লাগল ভেবে যে আমি এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলাম। বাসে ফিরে জানতে পারলাম, আমার ঠিক সামনের সিটে বসে থাকা তিন জনের ছোট্ট পরিবারটি, তাদের পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র ছেলেকে সাথে নিয়ে এই তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছে।

হিন্দু পূরাণে কথিত আছে, মহাদেব শিবকে তাঁর শ্বশুরমশাই অভিশাপ দিয়েছিলেন। আর মহাদেবের স্ত্রী স্বতী তাতে কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যা করলে, মহাদেব মাত্রাতিরিক্ত রাগান্বিত হয়ে স্ত্রীর শবদেহ ঘাড়ে করে তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। এই সময়েই স্বতীর মৃতদেহটি ৫১ টি টুকরো হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পরেছিল। তারই একটি টুকরো পরেছিল এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। আর একারণেই এটি হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান। আরও শোনা যায় যে,  এরকম মোট ৭ টি টুকরো বাংলাদেশের সাতটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে এসে পরে। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে চন্দ্রনাথের এই শিব মন্দিরটিই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হিন্দুদের একটি তীর্থযাত্রায় একত্র করতে সক্ষম হয়েছে।

ইতিহাস চিন্তা করতে করতে আমি কিন্তু আমার দুশ্চিন্তার কথা ভুলে যাইনি, বরং কিছুক্ষণের মাঝে আমার দুশ্চিন্তা সত্যি হল যখন দেখলাম যে ভোর ৬ টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই। অগত্যা, ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। সকাল ৭ টার একটু আগে বাস আমাকে আর সেই পরিবারটিকে সীতাকুণ্ড বাজারে নামিয়ে দিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দ্যেশ্যে চলে গেল। আর আমরা শুরু করলাম আমাদের তীর্থযাত্রা।

আমি এটুকু জেনে এসেছিলাম যে বাস থেকে নামতেই যাত্রা শুরু হয়, যা সীতাকুণ্ড বাজারের ভিতর দিয়ে চলতে চলতে এগিয়ে যায়। ব্যস্, সেভাবেই চলতে লাগলাম। ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি হলেও, বেশ শীত করছিল। তাই শুরু থেকেই হাঁটার গতি একটু বেশিই ছিল। হাঁটতে হাঁটতেই জানতে পারলাম, বাচ্চা ছেলেটির নাম পরশ আর তার কথা বলায় একটু সমস্যা রয়েছে; সে ‘র’ উচ্চারণ করতে পারেনা- সেটি ‘অ’ হয়ে যায়। আশা করব এই কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে উঠে মহাদেবের সান্নিধ্যে আসার তার ও তার পরিবারের প্রচেষ্টা সফল হবে। আমি তাদের সাথে আর খুব বেশিদূর ছিলাম না।

মেলায় ঢোকার মুখেই দেখতে পেলাম স্টেশনে দাঁড়িয়ে যাত্রা করতে উদ্যত ট্রেন- আমার বরাবরের ভালবাসার একটি। এই ভ্রমণের প্রথম ছবিটি তাই এই ট্রেনটিরই ছিল। সেই সাথে পরিচয় হয়ে গেল ব্যবসায়ী শ্রেণীর সক্রিয় উদ্যোগের সাথে। কষ্ট করে পাহাড়ে না চড়ে, ২০০/- দিয়ে গাড়িতে চড়ে পাহাড়ে উঠুন; আবার একই পরিমাণ খরচা করে, নেমে যান। যদিও আমি অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দ্যেশ্যেই গিয়েছিলাম কিন্তু সময় স্বল্পতার ভয়ে মনে মনে স্থির করে নিলাম, যদি একান্তই প্রয়োজন পরে তাহলে গাড়িতে চড়েই নেমে আসব। যাই হোক, আশেপাশের মানুষের অতি উৎসাহের খোরাক হতে হতে ও মেলায় প্রদর্শিত বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী দেখে মুগ্ধ হতে হতেই আমার একান্ত ব্যক্তিগত এই ভ্রমণ চলতে থাকল।

যাওয়ার পথে ঠিক করেছিলাম তখনি কোনো কিছু খাব না বা কোনো ছবি তুলব না, পাহাড় থেকে নেমে মেলাটি ঘুরে শেষ করতে হলে সময় বাঁচানো জরুরী ছিল। কিন্তু পেটের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও, ক্যামেরা আর আমার হাতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলাম না। বিশেষ করে ভিক্ষু বেশে মেলার রাস্তার দুই পাশে বসে থাকা বিভিন্ন কিসিমের যোগী, জটাধারী সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী, শিব-স্বতী ও মহাকালীর রূপে সেজে থাকা অসংখ্য অভিনেতার সামনে পরলে- ছবি না তুলে থাকা সম্ভব না। আর এভাবে এই মডেলদের ছবি তুলতে গিয়ে বেশ কিছুটা পকেট খরচাও করতে হয়েছে বৈকি- কেউ কি আর ফ্রি তে মডেলিং করবে! তবে আমি শুধু কিছু টাকাই ব্যয় করেছিলাম। বেশিরভাগ তীর্থযাত্রী টাকা-পয়সার পাশাপাশি চাল আর ডালের মিশ্রণে তৈরি শুকনো খাদ্য সামগ্রীও বিলিয়ে দিচ্ছিলেন, যাতে এই যোগীরা পরে রান্না করে খেতে পারে।

এভাবেই নিজের মত করে হাঁটতে গিয়ে সৌভাগ্যবশত, রাস্তা ভুল করে সোজা পাহাড়ের দিকে না গিয়ে, ভীড় দেখে হাতের ডানে ব্যসকুণ্ডে ঢুকে পরি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, রাস্তা ততটাও ভুল ছিল না। আর এটাই স্বাভাবিক নিয়ম- আগে ব্যসকুণ্ড, তারপরে পাহাড়। সৌভাগ্য একারণে যে, ঠিক ঐ সময়ে ব্যসকুণ্ডের ভীড় কিছুটা হলেও সহনীয় ছিল আর আমার মাঝেও, ভীড় ঠেলে মনভরে ছবি নেওয়ার মত শারীরিক শক্তি ছিল।

রামায়ণে কথিত আছে যে, শ্রীরাম যখন স্ত্রী শীতাকে নিয়ে বনবাসে ছিলেন, তখন দেবী শীতা এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের তলদেশে অবস্থিত এই পুকুরটিতেই স্নান করতেন। সে জায়গাটি এখন ব্যসকুণ্ড নামে পরিচিত, যেখানে পাহাড়ের চূড়োয় অবস্থিত মন্দিরের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা বা ট্রেকিং শুরু করার আগে পুরুষেরা মুণ্ডন করে স্নান করে পবিত্র হয়ে নেন। এমনকি ব্যসকুণ্ডের ঠিক বাইরেও মুণ্ডনের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে মাথার পাশাপাশি,  দাড়ি-গোঁফ কামানো ও বগলের চুল ছাঁটার ব্যবস্থাও । আর এসবই প্রকাশ্যেই করা হয়ে থাকে। পরে জানতে পারি যে, মাথা মু্ণ্ডনের এই ধাপটি তাঁদেরই করতে হয়, যাঁরা পরিবারের মৃতদের জন্য এই তীর্থযাত্রা করে থাকেন। সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক এই ধাপটি, পরিবারের যে কোনো একজন পুরো করলেই চলে। মহিলারাও এই পুকুরে স্নান করে থাকেন। তাছাড়া এই ব্যসকুণ্ডে বিভিন্ন ধরনের পূজারও ব্যবস্থা রয়েছে।

ব্যসকুণ্ড থেকে বেরোনোর পরে, একজন সহৃদয় পূজারী আমাকে রাস্তা চিনিয়ে দিলে, আমি আবার আমার যাত্রা শুরূ করি- সরাসরি পাহাড়ের উদ্দ্যেশ্যে, ছবি তুলতে তুলতে। বলে রাখা ভাল, এই থেমে থেমে ছবি তোলার কারণে আমার শারীরিক শক্তি ফিরে পাওয়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা সহজ হয়েছিল।

কিন্তু আমার তীর্থযাত্রা মন্দিরের চূড়ো অব্দি পৌঁছতে পারেনি; শুধু আমারই না, অসংখ্য তীর্থযাত্রীই সময় স্বল্পতার কারণে চূড়োয় পৌঁছতে পারেননি। মোটামুটি সাড়ে তিন মাইল, যাত্রার প্রায় অর্ধেক পথ, উপরে ওঠার পরে- সেই স্থানে অবস্থিত মন্দিরে, আগত দর্শনার্থীরা পূজা দিচ্ছিলেন। তাঁদের এই পূজা দেওয়ার কারণে সৃষ্ট জটলার শিকার হয়ে অনেকেই এই স্থানে দুই থেকে চার ঘন্টা যাবৎ বসে থেকে অপেক্ষায় রয়েছিলেন। এমনকি আমিও একই জায়গায় প্রায় ঘন্টাখানেক ওঠানামা করে সময় নষ্ট করেছি।

আর এই সময়েই আমার ভ্রমণকালীন ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনার একটি ঘটে যায়- যা ভ্রমণের কারণে সান্নিধ্যে আসা অপরিচিত মানুষের সাথে ঘটা, আমার জীবনের সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতাও বটে। সোলো ট্রিপে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেয়েরা বারবার কিছু সাধারণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন- বিশেষত, অবিবাহিত মেয়েরা। বিভিন্ন ব্লগে পড়েছিলাম, আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়াতে এধরনের ঘটনা একটু বেশিই ঘটে থাকে। এবারে নিজেও বেশ কয়েকবার এই ঘটনার সম্মুক্ষীণ হয়েছি। মিথ্যে বলব না, সব সময় কিন্তু ভাল লাগেনি; বরং, মাঝে মাঝে বেশ বিরক্তিবোধ হয়েছে। তো মজার ঘটনাটি এরকম- জনৈক তীর্থযাত্রী যখন জানতে পারলেন যে এই অবিবাহিত মুসলিম নারী একাই এই যাত্রায় এসেছে, তখন তিনি আমার সাথে একটি ছবিতে নিজেকে একটি অদ্ভুৎ শারীরিক ভঙ্গীমায় তুলে ধরার লোভটি সামলাতে পারলেন না!

তবে আমরা বসে থাকলেও, সময় কিন্তু বসে ছিল না। সকাল ৯ টা বাজছে প্রায়। যদি ঠিক এই স্থানে, এই সময়েই আমি ট্রেকিং শেষ না করি, তাহলে পুরো মেলাটা আর ইচ্ছেমত ঘুরে দেখা হবেনা। অথবা ঠিক সময়ে ফিরতি পথে যাত্রা করতে পারব না। তাই ট্রেকিং এখানেই শেষ করে, নিচে নামতে শুরু করলাম। উঠতে, নামতে, চলতে চলতে অনেক ধরনের মানুষের সাথে কথা হল। এদের মধ্যে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তীর্থযাত্রীও ছিলেন। কেউ কেউ জানালেন এখানে আসা অধিকাংশ অনুসারীই ভারতীয়। এছাড়া অন্যান্য দেশ থেকেও তীর্থযাত্রীরা এখানে এসেছেন।

কেউ আবার একটু দু:খ প্রকাশ করে জানালেন যে ভিনদেশীদের কারণে তাঁরা নিজের দেশেই যাত্রা পুরো করতে পারেননা। আবার অনেককেই বলতে শুনলাম যে, ভারতীয় তীর্থস্থানগুলোতে খাবার সহ অন্যান্য সুবিধার আয়োজন অনেক গোছানো ও সুন্দরভাবে পরিচালিত। অনেকের কাছেই জানতে পারলাম, প্রায় ১২ ঘন্টা ট্রেকিং করে তবেই তারা সফল হয়ে ফিরছেন। মনে মনে ভাবতে লাগলাম আরেকটি সঠিক সিদ্ধান্ত; আল্লাহ আমার সথেই আছেন ভেবে, মনের আনন্দে, শৈশবের আমেজে মেলা দেখতে বেরিয়ে পরলাম- মানে পাহাড়ের নিচের দিকে নামতে থাকলাম আর কি!

আসলে তো আমার এই যাত্রার প্রধান উদ্দ্যেশ্য ছিল এই মেলাটি, যা শুধু ধর্মীয় কারণেই নয়, দেশীয় ঐতিহ্যের কারণেও বিখ্যাত। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের কারিগর, হস্তশিল্পী ও রন্ধন শিল্পীরা নিজেদের শিল্প ও সামগ্রীকে এই মেলায় তুলে ধরেন। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে ৫০ ধরনের শুকনো মিষ্টি জাতীয় খাবার, আঁচার, ঘিয়ে ভাজা বিভিন্ন ধরনের হালকা রসাল মিষ্টি, ছোট আকারে তৈরি বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতীমা, পূজায় ব্যবহৃত সব ধরনের সরঞ্জামের অসংখ্য উপস্থাপনা, ছোট ছোট মন্দির, আবীর, শাঁখা ও সিঁদুর এর দোকান, তুলসীর মালা, বাঁশের তৈরি নানান ধরনের বাঁশি, শ্লোক ছাপা বস্ত্র, মাদুর, দা-বটি-ছুরি জাতীয় পণ্যের দোকান, পূজোয় ঘরোয়াভাবে ব্যবহৃত ঢাক, ট্রেকিং এর জন্য উপযোগী ও নকশাদার বেতের তৈরি লাঠি যা অনায়াসে ঘরে সাজিয়ে রাখা যায়- আমি শুধু ভাষায় এগুলো প্রকাশ করতে পারব না।

আর ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় মিষ্টান্ন- খিস্সা। দুধের সর ও ঘি দিয়ে তৈরি এই খাবার টি বগুড়া জেলার বাইরেও যে কোথাও তৈরি হয়- তা আমার জানা ছিল না। ফরিদপুর, নওগাঁ, কুমিল্লা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফেণী সহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসকল দ্রব্য ও খাদ্য সামগ্রী নিয়ে এই শিল্পীরা এই মেলায় আসেন এবং প্রতি বছর আসেন। কোনো কোনো দোকানে আমি কিছু খাবার খেয়ে দেখলাম- কিনতে হয়নি, তারা শুধু চেখে দেখার জন্যও যথেষ্ট পরিমাণে দিয়েছিলেন। তবে চালের গুড়া দিয়ে তৈরি শুকনো জিলাপী আমার আর খেয়ে দেখা হয়নি। খাবারটা দেখে পছন্দ হয়নি, তাই কিনতেও আগ্রহ পাইনি।

পাহাড় থেকে নেমে প্রথমে জগন্নাথ মন্দিরে ঘুরলাম, বলা বাহুল্য, ছবিও তুললাম। উপরে ওঠার সময়ে নজরে পরেছিল একটি শিব মন্দির। যেখানে মহাশ্মশান এর উন্নয়ন কাজের জন্য দানবক্স এ দানের কাজ চলছিল। আমি অবশ্য অতটা দয়ালু নই, যদিও শ্মশানের সন্ধানেই গিয়েছিলাম। কিন্তু সে সাধ এখনও অপূর্ণই থেকে গিয়েছে। তবে আরও অনেক অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রথমেই দেখা মিলল, বজরংবলী তথা হনুমান দেবের মূর্তির। তারপরেই মন্দিরের ভিতরে খালি পায়ে ঢুকে দর্শন করলাম স্বয়ং মহাদেব এর। দেখলাম শিবভক্তরা কিভাবে পরম যত্ন, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এবং সেই সাথে দুধ ও নানা রকম ফলমূল দিয়ে শিবলিঙ্গটির পূজা-অর্চনা করছেন। শুধু শ্রদ্ধা জ্ঞাপনই নয়, অভুক্ত শরীরে কে কার আগে মহাদেবকে তুষ্ট করতে পারেন- সে নিয়ে প্রতিযোগিতাও চলছিল। আর আমার ভুল ধারণা ভাঙল যখন দেখলাম, এই পূজা ‍দিতে পুরুষেরাও সমান সক্রিয়।

দর্শন শেষ করে, মহাদেবের একটি প্রতিচ্ছবি ক্যামেরাবন্দী করে ভেতর থেকে বাইরে এলাম। আর দেখলাম আমার জুতোজোড়া জায়গামত থাকলেও, বেতের তৈরি ট্রেকিং পোলটি আশেপাশে আর কোথাও নেই। এখন এই পোল পাহারা দেওয়া তো আর পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পরেনা, আর আমাকেও কেউ বলেনি পোলটি দায়িত্বহীনভাবে ফেলে রেখে ছবি তুলতে। অগত্যা, অন্য কারো উপকারে লাগছে – এটা ভেবে কষ্টটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। ভাবছেন, বেতের তৈরি সামান্য একটা লাঠি নিয়ে এত আবেগের কী আছে? এটা শুধু ট্রেকিং করতে গেলেই টের পাবেন।

মন্দিরের আঙ্গিনাতেই দেখা মিলল শিব মন্দিরের খু্ব সাধারণ ও চিরন্তন এক ভক্তদলের, যারা সিদ্ধি আর তামাক পাতা দিয়ে তৈরি ‍সিগারেট এখানে বেশ খোলাখুলিভাবেই বিক্রি ও সেবন করছিল। আর পণ্য প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতাদের মধ্যে যুবক থেকে প্রৌঢ়া – সকলেই ছিলেন। মাত্র ২০ টাকায় ১ টি সিগারেটের পাশাপাশি, ‘হোল্ডার’ নামে পরিচিত সেবনকাজের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণটিও ২০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছিল। আর মাটির তৈরি হস্তশিল্পের ছোঁয়া এখানেও নজরে পরার মতই ছিল। শিব মন্দিরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, সেবনরত অবস্থায় ব্যবহৃত তামাকবাহী এই উপকরণটির গায়ে করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সাপের নকশা। সংগ্রহের জন্য এক প্রৌঢ়ার কাছ থেকে আমিও একটি নমুনা কিনে নিলাম। এই মাদকদ্রব্যের প্রস্তুতকারীদের কয়েকজন ছবি তোলার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, আবার অন্যরা ছিলেন বেশ সাহসী। তবে একা একজন মেয়ে হওয়া সত্বেও আমাকে কিন্তু কোনোরকম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।

সকাল ১০ টা বাজতে লাগলে আর ক্ষুধা ভুলে থাকতে পারিনি। লুচি আর লাবড়া দিয়ে নাস্তাটা সেড়ে নিই। উল্লেখ্য, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই সময়ে নিরামিষ ভোজন করে থাকে। নারীরা রীতিমত উপোস করে থাকে। আর উপোস অবস্থাতেই পাহাড়ে চড়ে! মেলায় আগতদের খাবারের আয়োজন ও আপ্যায়নের জন্য অসংখ্য অস্থায়ী রেস্তোরাঁ ছিল- যেখানে লুচি, পরোটা, জিবেগজা, চিনির জিলাপী, গুড়ের জিলাপী, ভাত, বুটের ডাল ভুনা, লাবড়া, সিঙ্গাড়া, চা সহ সব ধরনের মুখরোচক খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। রান্নাও চোখের সামনেই হয়ে থাকে। এছাড়া আধুনিক কনফেকশনারী জাতীয় খাবারের সরবরাহও রয়েছিল মেলায়।

এমনকি সরকারি উদ্যোগে মেলায় আগতদের বিনামূ্ল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থাও ছিল। ছিল নিরাপত্তা রক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। আর মেলায় আগত অনেক দুষ্কৃতীকারীকেই চোখের সামনে কোমরে দড়ি বেধে নিয়ে যেতে দেখেলাম। সেই সাথে ছিল সেচ্ছাসেবক বাহিনী যারা মেলার ভীড় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি ভীড়ের মাঝে অনেকেই স্বজনহারা হলেও, যা খুব সাধারণ ঘটনা আর হরহামেশাই ঘটছিল, সহজেই মেলা পরিচালনা কমিটির অস্থায়ী অফিসে গিয়ে মাইকে ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

আমি এসবকিছুই বেশ উপভোগ করছিলাম- একবারের জন্যও মনে হয়নি যে আজ সকাল থেকে সোস্যাল মিডিয়ার তথা ফেসবুকের ফেসটা এখনো দেখা হয়নি। এমনকি, এই বিশেষ দিনটি কে কীভাবে কাটাচ্ছে এটা দেখার কথাও মনে আসেনি। কারণ আমি নিজে এর চেয়ে ভালভাবে কাটাতে পারতাম না। এক জায়গায় এত অল্প সময়ে এত এত অভিজ্ঞতা, তাও আবার একা- ভাবা যায়? তাই এক পর্যায়ে ভাবতেই বসে গেলাম। আর একটু বিশ্রামেরও প্রয়োজন ছিল। অবস্থান: রামকৃষ্ণ মিশন, মেলা প্রাঙ্গণের ভিতরেই।

এখানে বেশ খানিকটা সময় আমি শুধু চুপচাপ বসে থেকে কাটিয়েছিলাম। এতখানি অ্যাডভেঞ্চার ও শারীরিক ধকলের পর এই বিশ্রামটি আমার জন্য মেডিটেশনের চেয়েও অনেক বেশি উপকারি ছিল। আসলে, শুধু বসে তো আর ছিলাম না, আশেপাশের মানুষগুলোকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করছিলাম, যাকে বলে ‘পিপল্ ওয়াচিং’। এটা আমার খুব পছন্দের একটা কাজ। তাছাড়া এখানে বসার কারণেই দেখতে পেলাম যারা একাধিক দিন এই মেলায় কাটাচ্ছেন, তারা কোথায় আর কীভাবে থাকছেন। বলে রাখা ভাল, মেলা প্রাঙ্গণেই এরকম অনেক অস্থায়ী ঘর ভাড়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এক সময় মনে হল কোনো গল্পের কাহিনীতে আছি যেখানে কেউ আমাকে চেনে না, আমি কাউকে চিনি না। আমি নিজেই আমার এই গল্পের লেখক ও পরিচালক। তাই ঠিক করলাম- গল্পটাকে শুধু এই মেলার গণ্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব না। এরকম সুযোগ সব সময়ে আসবে না। আর হাতে সময়ও বেশি নেই। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই যতটুকু সম্ভব এই ছোট্ট মফস্বল শহরটাকে ঘুরে দেখব। তাই আবার পায়ে পায়ে যাত্রা শুরু। চলতে চলতে ‍আশেপাশের ছবি তোলা কিন্তু থেমে থাকেনি। 

মেলা থেকে বেরিয়েই সোজা চলে যাই রেলওয়ে স্টেশনে। ট্রেন ছিলনা তখন, কিন্তু অনেক মানুষ ছিল। আর এরকম ছবির মত সুন্দর ছোট্ট ছিমছাম রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম আমি শুধু মুুভি আর ছবিতেই দেখেছি। ইচ্ছা ছিল এখানেও কিছুক্ষণ বসে কাটানোর- অন্তত এক কাপ চা খাওয়ার। সকাল থেকে এমনিতেও এই চা-টা আর খাওয়া হয়ে উঠেনি। কিন্তু একেতো সময় কম, তার উপরে আবার স্টেশনের সবার চোখে আমি ছিলাম যেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণীর চেয়েও বেশি বিনোদনমূলক। তাই কিছু ছবি তুলে, পুরো স্টেশনটা হেঁটে ঘুরে দেখলাম। তারপর অন্য একটা দিকে এগিয়ে গিয়ে সীতাকুণ্ডের সাধারণ মানুষদের জীবনযাপন কিছুক্ষণ দেখলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত পদদ্বয়ের উপরে দয়া হল। তাই একটা রিক্সা ডেকে বললাম- বাস স্ট্যাণ্ড।

অভিজ্ঞতার এখানেই শেষ নয়। আমার মত আরও অনেককেই দেখলাম বাসের জন্য অপেক্ষারত। ক্লান্ত, কিন্তু তীর্থযাত্রী বা অভিযাত্রী – সকলেই ছিলেন, পরিতৃপ্ত। চট্টগ্রাম থেকে আগত ঢাকাগামী একটি বাসে আমরা মোট আঠার জন উঠলাম। বিভিন্ন ধরনের মানুষ- নিজ দলের বাইরে কেউ কাউকে চিনিনা। অথচ, আমাদের সবার মধ্যেই এক ধরনের ঐক্য কাজ করছিল। এ অনুভূতি আমার পরিচিত- প্রতিটি ট্রিপেই হয়ে থাকে। তাই মুখে পরিতৃপ্তির হাসি আর মনে বিজয়ের প্রশান্তি নিয়ে ঘুম দিলাম। ঘুম ভাঙতে দেখলাম, মেঘনা পার হচ্ছি। সূর্য ডুবছিল। অসাধারণ সুন্দর একটি সূর্যাস্ত কিছুক্ষণ চোখে ভরে নিয়ে, ক্যামেরা বের করে মুহুর্তটি চলতি বাসে বসেই বন্দী করে নিলাম।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ৯ টা। পুরো ২২ ঘন্টা পরে, বাড়ি ফেরার সাথে সাথেই মনে হতে লাগল- আবার কবে?

0 comments

Leave a comment

Login To Comment