Image

A Tour to Remember

চারপাশে ঘন জঙ্গল মাড়িয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিয়ে ঘেমে একাকার হয়ে যখন গন্তব্যে পৌঁছাবো সেখানে আমাদের রাজকীয় অভ্যর্থনা জানাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে বিশাল পাহাড়। সেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণার গান শুনিয়ে আমাদের বরণ করে নেবে। তার ঠান্ডা জলে ক্লান্তি-তেষ্টা মিটাবো। চোখ জুড়িয়ে দেখবো সে সৌন্দর্য।ভেবেই যেন আনন্দে নেচে উঠে মন। যেই ভাবা সেই কাজ। দশজনের দল আমাদের।পরিকল্পনা বেশ কয়েকটা ঝর্ণা দেখার। সে অনুযায়ী আমরা ঢাকা থেকে বাসে চট্রগ্রাম তারপর লোকাল বাসে কাপ্তাই নামলাম।  কাপ্তাই থেকে নৌকা নিয়ে যেতে হবে  বিলাইছড়ি। কাপ্তাইয়ের বুকে কয়েক ঘন্টার নৌকা ভ্রমণ; ভেবেই সবাই খুশিতে গদগদ। কিন্তু ট্যুরের প্রথম অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা তখনই ঘটল। ঘটনাস্থল নৌ-ঘাট। স্থানীয় একজনের  ভাষ্যমতে আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখানে পাহাড়ি দস্যুদের আক্রমণ বেড়েছে তাই মেয়েদেরসহ যাওয়া ঠিক হবে না।কিন্তু আমরা বেশ কয়েকটা ট্যুর গ্রুপের মেম্বারদের সাম্প্রতিক  রিভিউ নিয়ে বিস্তারিত জেনেই গিয়েছিলাম ;এরকম তথ্য কেউ দেয়নি। ব্যাপারটা নিশ্চিত হতে যোগাযোগ করেছিলাম সেই এলাকার দায়িত্বে থাকা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচিত একজন অফিসারকে। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। তিনি সপ্তাহ খানেক আগে বদলি হয়েছেন তবে এটুকু বললেন এধরনের কোনো ঘটনা উনার জানামতে ঘটেনি।একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই নৌকার ভাড়া নিয়ে সমস্যা হল। বহু কথা খরচের পর নৌকা ঠিক করে যাত্রা শুরু হলো আমাদের। উপরে আকাশ,এই মেঘ এই রোদ,মৃদুমন্দ বাতাস, দুপাশে সবুজ গ্রাম, কাপ্তাইয়ের পানি এসব কিছুর ছোঁয়ায় ভুলেই গিয়েছিলাম সকল ঝামেলার কথা। এভাবেই একসময় আমরা গিয়ে পৌঁছলাম গাছকাটা চেকপোস্টে। পারমিশনের জন্য নৌকা থামানো হলো, কাগজপত্র দেখানো হলো কিন্তু পারমিশন দেয়া হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম একটা মিটিং হচ্ছে তাই কিছুক্ষণ দেরী হবে। প্রায় এক ঘন্টা  পর পারমিশন নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো। তারপর বিলাইছড়ি পৌঁছে থাকার ব্যবস্থা করে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে নিতেই দিন তখন দুপুরের শেষ দিকে।আবহাওয়া ভালো, কড়া রোদ।কিন্তু দিন যেহেতু শেষের দিকে তাই আশেপাশের অন্যান্য ঝর্ণা দেখা ক্যান্সেল করে সবাই বেড়িয়ে পড়লাম গাছকাটা ঝর্ণার পথে।সাথে নিলাম স্থানীয় গাইড। কিছু দূর নৌকায় গিয়ে তারপর হাঁটা শুরু।পাহাড়ি উঁচু নিচু রাস্তায় হাঁটার সুবিধার জন্য গাইড বাঁশের খুঁটি কেটে দিলেন সবাইকে।হেঁটে চলছে সবাই। পথে বুনো প্রাণী, জংলী গাছ, জোঁক, কেঁচো, সাপ,অদ্ভুত আঁকাবাঁকা রাস্তায় স্থানীয়দের হাঁটার গতি সবকিছুই তখন মুগ্ধ করছে আমাদের। দূর থেকে ভেসে আসছে পাহাড়ি পাখির গান।অনেকটা পথ হাঁটার পর হঠাৎ গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো আর যেন আমাদের জীবনে নেমে এল মুভির বাস্তব রূপ। এক ভিলেন মুভির মত যদি বৃষ্টিতে ময়ুরের নাচ দেখতে পেতাম!কিন্তু আমাদের আগ্রহে পানি ঢেলে দিয়ে গাইড জানালেন ময়ূর নেই এখানে। আশেপাশে কিছু বাঁধা গরু ছিল ফ্যালফ্যালিয়ে আমাদের দেখছে। এরমধ্যেই আরেকদল ট্যুরিস্টের সাথে দেখা যারা ঝর্ণা দেখে ফিরছেন তখন। বললেন আর কিছুদূর গেলেই দেখা পাওয়া যাবে ঝর্ণার ঝিরিপথের। ততক্ষণে বৃষ্টি একটু বাড়লেও আমরা প্রবল আগ্রহে হেঁটে যাচ্ছি।পথিমধ্যেই ছোট্ট ছোট্ট পানির ধারা আমাদের বলে দেয় সামনেই ঝিরি তারপর ঝর্ণার মুখ।আর বৃষ্টিতে সেটা কত বেশি সুন্দর লাগবে ভেবেই যেন গতি বেড়ে যায় আমাদের। কিন্তু হাঁটছি তো হাঁটছিই।ঝিরির দেখা নেই।এরপর প্রায় আরো ঘন্টা দেড়েক হেঁটে আমরা পেলাম ঝিরির দেখা।অদ্ভুত সুন্দর তার রূপ। অনেক উঁচু শক্ত ঢাল বেয়ে পড়ছে ঝিরিঝিরি পানি।সাথে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। আমরা মুগ্ধ। ছেলেরা দুইজন সেই ঢাল বেয়ে একটু উপরে উঠে তারপর গা ছেড়ে দিয়ে স্লিপ খেয়ে নামছে।এরচেয়ে আনন্দের যেন আর কিছু নেই।খুশিতে টগবগ করছে সবাই। এখন ঝিরিমুখ দেখার পালা।নতুন উদ্দামে হাঁটা শুরু করলাম আমরা কিন্তু ততক্ষণে বৃষ্টিতে পাহাড়ি রাস্তাটা ভয়ংকর পিচ্ছিল হয়ে গেসে।সাবধানে হাঁটতে হবে ভাবতে না ভাবতেই গ্রুপের একজন মুখ থুবড়ে পড়ে গেল একটা ছোট পাথরের উপর। কপাল, দাঁতের পাশ থেকে বের হচ্ছে রক্ত।সাথে সাথেই আশেপাশে খুঁজে একটা পাহাড়ি পাতার রস লাগিয়ে রক্ত পড়া থামানো গেল।গাইড বললেন বৃষ্টিতে সামনের রাস্তা আরো স্যাঁতসেঁতে হয়েছে, যেতে প্রায় এক ঘন্টা লাগতে পারে। এদিকে বিকেল প্রায় শেষের দিকে। আমরা বুঝতে পারলাম ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ফিরতি পথ ধরলাম। পাহাড়ের সুন্দর রূপের উল্টো দিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেটাই পদে পদে টের পেলাম ফেরার পথে। বৃষ্টিতে ভেজা ঢালু,সরু পথ আর পাশেই বৃষ্টির পানিতে পূর্ণ নীচু খাদ  যেন অজানা বিপদের ফাঁদ পেতে রয়েছে। মুহূর্তের অসচেতনতা ঠেলে দিতে পারে ভয়ংকর কোনো অভিজ্ঞতার দিকে। সবাই সবার হাত ধরে লাইন করে হেঁটে যাচ্ছি। প্রতি পদক্ষেপে পা পিছলে যাবার ভয়।সবাই শক্ত করে হাত ধরে হাঁটার কারণে দু একবার  পড়ি পড়ি করেও বেঁচে গেলাম। কিছুক্ষণ আগেই যে জায়গাগুলোতে নামমাত্র পানির ধারা ছিল সেগুলো এখন ছোট খাটো এক একটা পুকুর। বুঝতে বাকি রইল না যে যাওয়ার সময় যেটাকে আমরা ঝর্ণার পানির ধারা ভেবেছিলাম সেটা আসলে ছিল হালকা বৃষ্টিতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল।বিপদের আঁচ টের না পেয়ে তখন আমরা উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম।সেখানে  গাইড একটু সাঁতরে পানির গভীরতা বুঝার চেষ্টা করলেন।বললেন অনেক পানি।পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির লম্বা ছেলেটা সাহস করে পা টিপে টিপে বুঝার চেষ্টা করে গভীরতা কত বেশি। কিছু দূর যেতেই সে প্রায় ডুবুডুবু। ফেরত আসে; বলে আনেক পানি সাথে তীব্র স্রোত।  এদিকে চারজন ছাড়া বাকিরা কেউ সাঁতার জানে না। ভয়েই যেন হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে আসছিল সবার। অভয় দেয় গাইড। এক হাতে একজনকে ধরে সাঁতার দিয়ে পার করে দিয়েছেন এক এক করে সবাইকে।প্রচন্ড স্রোত যেন গাইডের হাত থেকে ছুটিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর।তবুও ঘোলা জলে ঘুরপাক খেয়ে তিনি পার করে দিয়েছেন দশজনের গ্রুপের  সবাইকে।গাইডের দক্ষতায় আর গ্রুপের সবার পারস্পরিক সহযোগিতায় এভাবে তিনটা খাদ পার হয়ে, আর হাঁটু পানি হেঁটে এসে অবশেষে দেখা মিলে হালকা সমতল পথের। আতংকে সবাই সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছে তখন। এদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি মাটি-জংগলের গন্ধের সাথে ঝিঁঝিঁ পোকা আর বুনো শুকোরের শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত ছমছমে রহস্যময়তা সৃষ্টি করেছে আমাদের ঘিরে। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম চশমাটা ভেসে গেছে। হালকা অন্ধকারে ঘোলা চোখে পিচ্ছিল পথ ধরে  হেঁটে চলছি নৌকার দিকে। জীবন নিয়ে নৌকায় উঠতে পেরে গাইডকে মনে হচ্ছিল সৃষ্টিকর্তার পাঠানো দূত। যার কাছে যতটুকু টাকা ছিল সবই দিলাম উনাকে তবুও যেন মন ভরছিল না। মনে হচ্ছিল টাকা দিয়ে এ ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়।নৌকায় উঠেও যেন ভয় থামছিল না। যেন এখনই আবার কোনো অঘটনের শিকার হয় নৌকা। আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর তখনই আমাদের ভয়কে সত্য প্রমাণ করতেই পাহাড়ি ঢলে ভেসে আসা এক বিশাল কাঠের গুড়ি স্রোতের সাথে তেড়ে আসছিল আমাদের নৌকার দিকে। এটা নৌকায় লাগলে কী হতে পারে ভেবেই মুখের বোল হারিয়ে ফেলেছে সবাই।মাঝির দক্ষতায় সেটাকে কোনোরকম পাশ কাটিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পেলাম দ্বিতীয় বারের মতো । এরপর পুরো পথে হোটেলে পৌঁছার আগ পর্যন্ত কারোর মুখে কোনো কথা নেই। সবাই হয়তো মনে মনে সৃষ্টিকতাকেই স্মরণ করছিল তখন। হোটেলে ফিরে ফ্রেশ  হতে গিয়ে টের পাওয়া গেল গায়ে ছোট ছোট  জোঁক লেগেছে। যে যুদ্ধ জয় করে এসেছি তারপর আর জোঁক কোনো ব্যাপার না। কায়দা করে সেসব ছাড়িয়ে রাতের খাবারের পর সবাই বসলাম হোটেলের ছাঁদে। আতংক কাটিয়ে উঠার চেষ্টামাত্র। মাথাটা তখনো ঝিম ধরে আছে।অন্ধকার চারপাশ। সামনেই কাপ্তাইয়ের পানি বয়ে চলেছে। রুটির মতো গোল চাঁদটা পানিতে নেমে এসে যেন স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে অভয় দিচ্ছে আমাদের।

এমন অভিজ্ঞতায় পরদিন ধুপপানি ঝর্ণা দেখার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে রাঙামাটি শহর ঘুরে শুভলং ঝর্ণা দেখে ঢাকার পথে রওনা দিয়েছিলাম আমরা।  তবে এতশত কঠিন অভিজ্ঞতা ছাড়াও এ যাত্রায় মনে রাখার মতো আরেকটি ব্যাপার হলো পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষদের ব্যবহার আর সেখানকার খাবার । সেখানকার সাধারণ বাঙালীদের ব্যবহার খসখসে হলেও আদিবাসীরা সবাই খুবই আন্তরিক।চমৎকার তাদের আপ্যায়ন। আর এত সুস্বাদু তাদের রান্না!এখনো ক্ষুধা লেগে যায় ভাবলে।

  •  Trip to Bilaichori and Rangamati
  •  Bangladesh
  •  Bilaichori,Rangamati
  •  Bus
  •  Local cottage
  •  Local hotel

0 comments

Leave a comment

Login To Comment