Image

মেঘের রাজ্যে একদিন

ভার্সিটিতে প্রতি বছরই বন্ধুরা মিলে কয়েকটা ট্যুর (সম্ভব না হলে কমপক্ষে একটা) নিয়মের মতন বানিয়ে ফেলেছিলাম একেবারে প্রথম বছরেই। প্রথম দিকে সবার আগ্রহ থাকত প্রচুর, সঙ্গীও হইত অনেক, কাছাকাছি কোথাও যেতাম। সময়ের সাথে সাথে এই সংখ্যা আসলো কমে। মানে যেটা হয় আরকি – সবাই সবার নিজের মতন অলিখিত গ্রুপ বানিয়ে ফেলে, আলাদা করে নেয় যাদের সাথে মিলে না তাদের থেকে। তো এরপরও আমরা যে ক’জন প্রতি বছরের সেই নিয়মটা ভার্সিটির শেষ বছরও পালন করে গেছিলাম এ গল্পটা তাদের নিয়েই।

 

সময়টা আগস্টের মাঝামাঝি, ২০১৭। বর্ষার সাজেক দেখতে যাওয়া হয়নি এর আগে। ৭ জন যাবে মোটামুটি নিশ্চিত ধরে সব পরিকল্পনা করে ফেললো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে পারা বন্ধুটা। কিন্তু পাহাড় ধস এর কিছু খবর শুনতে পেয়ে সবার বাসা থেকেই কেমন একটু না যেতে দেয়ার চেষ্টা। তাই একেবারে বর্ষা পার করেই সেপ্টেম্বরের শুরুতে করা হলো টিকেট। আমরা যাব খুলনা থেকে ৪ জন, ঢাকা থেকে উঠবে ২ জন, আর একজন ছুটিতে বাড়ি গেছে, রাঙ্গামাটিতেই। তো যেয়ে ওর বাসায়ই প্রথম উঠার কথা, তারপর একটু ঘুম টুম দিয়ে পরদিন সাজেক। যাওয়ার ঠিক আগ দিয়ে সব কিছুর পরিকল্পনা করলো যে, তার দাদি ভয়াবহ অসুস্থ। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ঐ বন্ধুই বললো তোরা আমাকে রেখেই যা, পরে তো আর একসাথে এভাবে হবে না, সবাই চাকরি-সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে সামনে। তাই করলাম শেষমেশ।

 

ট্যুরের উদ্যোক্তাকে বাদ দিয়েই রওনা দিতে হল ৪ তারিখ। ৫ তারিখে বন্ধুর বাসায় থেকে পরদিন সকালে চাঁদের গাড়িতে করে সাজেক। যাওয়ার পথের অভিজ্ঞতাটাই বোধহয় ছিলো সবচেয়ে মজার। চাঁদের গাড়ির ছাদে উঠে পাহাড়ের উঁচুনিচু পথ বেয়ে সাজেকের চুড়ায় উঠার ব্যাপারটা রোলার-কোস্টার চড়ার থেকে কোনো অংশে কম নয়। গাড়ির ছাদে উঠতে বিজিবি গার্ড অবশ্য নিষেধ করে, কিন্তু ঐ রাস্তা দেখার পর ছাদ থেকে নামা তখন আর সম্ভবই না। আর অন্য সব গাড়িতেও সবাই ছাদেই যাচ্ছিলো।

 

মেঘের দেশে পৌঁছে কটেজে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়ার পর বের হলাম ঘুরতে। মেঘ ছুঁয়ে হাঁটাহাঁটি আর ছবি তুলে যখন সাজেকের সর্বচ্চো চূড়া কংলাক পাড়ায় পৌঁছেছি তখন সূর্য ডুব দিচ্ছে। এর মধ্যেই আশেপাশে ঘুরতে থাকা মেঘ গুলা জমাট বাধা শুরু করলো। দেখতে না দেখতেই বৃষ্টি। অন্য অনেকের মতই আমরাও আশ্রয় নিলাম একটা কটেজের সামনে করা টিনের ছাউনির নিচে। ভাবলাম পাহাড়ি বৃষ্টি, হয়তো তাড়াতাড়িই থেমে যাবে। ৫মিনিট যায়, ১০ মিনিট যায়, কোথায় থামাথামি, বরং সন্ধ্যে নেমে যাওয়ায় চারদিক অন্ধকার। অনেকেই বৃষ্টিতে ভিজেই কংলাক এর চূড়া থেকে নামতে শুরু করলো। কিন্তু আমরা ভাবলাম আরেকটু দেখি, এই পানির ভিতর পাহাড়ে পায়ে হেঁটে নামা বিপদজনক। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বৃষ্টি আর বাতাস ২টার বেগই যখন বাড়তে শুরু করলো তখন বুঝলাম আজ আর নিস্তার নেই। সবচেয়ে বড় ঝামেলা টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন, আর বন্ধুর ক্যামেরা। যা হোক, একটা পানির কার্টুন এর দুই দিক খোলা পলিথিন কুড়িয়ে নিয়ে ওর ভিতরেই ক্যামেরা দিয়ে নামা শুরু করলাম কংলাক এর চূড়া থেকে।

 

পা পিছলানোর ভয়ে নামতে হলো বেশ আস্তে-ধীরে। ভাগ্য ভালো পিছনে একটা গ্রুপ ছিলো যাদের ওয়াটার প্রুফ মোবাইল ফোন ছিলো। তাদের ফ্লাশ লাইটের আলোয় অন্তত দেখে শুনে নামতে পারলাম একদম খাঁড়া অংশটুকু। কিন্তু এরপরও অনেক পথ বাকি। পিছনের ঐ গ্রুপটা এই ঝড়ের মধ্যেই সেলফি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমরা হয়ে গেলাম আলাদা। যেহেতু রাস্তা একটাই, তাই বন্ধুরা মিলেই যা আছে কপালে ভেবে দৌড়াতে থাকলাম। তবে খেয়াল রাখলাম কেউ যেন দলছাড়া না হয়, একটু পরপরই থেমে ডাক দিয়ে সবাই আছি কিনা জেনে এগোতে থাকলাম। এর মধ্যে শুরু হলো বজ্রপাত। এক বন্ধু বলে উঠলো, “পাহাড় যেহেতু উঁচু, বজ্রপাতে মরার চান্সও তাইলে এখন বেশি”

 

অবশ্য বিদ্যুৎ চমকানোতে একটা সুবিধাও পাচ্ছিলাম, চারদিক দেখে নেয়াও হয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে ঘণ্টাখানেক দৌড়ে যখন কটেজে ফিরলাম, তখন সবার মুখগুলা হয়েছিলো দেখার মতন। বৃষ্টি থামলো সবাই শাওয়ার নিতে ঢুকছে তখন। এডভেঞ্চারের আশায়ই আসছিলাম, কিন্তু এত এডভেঞ্চারের মধ্যে পড়ব ভাবিনি। পরে খেয়েদেয়ে আবার বের হয়েছিলাম রাতে। তখনও আকাশে মেঘ, তাই সাজেকের জ্যোৎস্না দেখার সৌভাগ্য হয়নি। পরে বৃষ্টিও এসেছিল আবার, তবে অমন তোড়জোড় করে নয়, সুন্দর ঝিরঝির বৃষ্টি।

  •  Sajek Tour
  •  Bangladesh
  •  Sajek Valley, Rangamati, Bangladesh
  •  Sajek tour
     Sajek tour
     The trip story is also attached as a pdf file here
  •  Bus
  •  1800/person
  •  Around 150/meal/person

0 comments

Leave a comment

Login To Comment