Image

সীমান্তরেখা: সুন্দর ও সংগ্রামের আখ্যান

সীমান্তরেখা: সুন্দর ও সংগ্রামের আখ্যান

কুলুমছড়া; সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম।
কুলুমছড়ার উত্তর দিকে ভারত সীমান্ত যার পুরোটা জুড়ে রয়েছে বড় বড় পাহাড়। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বাংলাদেশের অংশ শুরু। কুলুমছড়ার অবস্থান সীমান্তবর্তী পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমিতে।

পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে কয়েকটা ছড়া বয়ে চলেছে কুলুমছড়ার বুকজুড়ে। সবচেয়ে বড় ঝর্ণা থেকে একটি নদীর উৎপত্তি ঘটেছে। নদীর নাম পাগলা। কুলুমছড়া কোন স্বীকৃত পর্যটন স্পট না হওয়ায় এখানে গ্রামের বাসিন্দারা ছাড়া অন্য কোন মানুষজনের আনাগোনা নেই বললেই চলে।

দশটা বাজলেই কুলুমছড়ায় গভীর রাত নামে। খানিকটা দূরের পাহাড়ি ঝর্ণা বেয়ে পাথরে আছরে পরা পানির শব্দ, পায়ের কাছের ব্যাঙ আর ঝিঝি পোকার ডাক তখন থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে। প্রকৃতির এতোসব আয়োজনের মাঝে ঝিরির ঠান্ডা পানিতে পা ভেজালে মনে হয় বেঁচে থাকা আনন্দের, জীবন সুন্দর।

পাহাড় চূড়ায় আটকে পরা মেঘদল, চেনা-অচেনা পাখির ডাক, পাগলা নদীতে মহিষের পালের গা ভেজানো কিংবা সাকোর উপর জোড়া শালিকের খুনসুটির দৃশ্য যতটা মুগ্ধ করবে তারচেয়ে বেশি অবাক করবে এখানকার মানুষের সংগ্রামী জীবন।

এখানে এসে খাদিজা নামের এক ছোট্টো লক্ষী মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। খাদিজা এ বছর স্কুল থেকে প্রাইমারি শেষ করেছে। এখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার কথা অথচ সে এখন পাশের মাদ্রাসায় তৃতীয় শেণীতে পড়ছে। এমন কেন হলো প্রশ্ন করতেই জানা গেল হাইস্কুল এখান থেকে অনেক দূর। পায়ে হেটে দেড় ঘন্টা সময় লাগে পৌঁছোতে, যানবাহনের কোন ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টিতে পায়ে হাটাও কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়। কষ্ট করে হাইস্কুলে গিয়েও লাভ নেই, আট ক্লাস পার করার আগেই সব মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয় এখানে।

কুলুমছড়ার ঘরে ঘরে এমন অসংখ্য খাদিজা আছে। যারা কখনো সাগর দেখেনি, লোনা জলে পা ভেজায়নি, টিভি সিরিয়াল কিংবা থিয়েটারে গিয়ে মুভি দেখেনি। খুব অসুস্থ না হলে ডাক্তার দেখানো ছাড়া যাদের শহরে যাওয়া হয় না। সুযোগের অভাবে ডাবল প্রাইমারি পাস করলেও কখনো ক্লাস সিক্সে পড়া হয় না।

কুলুমছড়ার প্রতিটা ঘর কৃষি কাজের সাথে জড়িত। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে ফসল ঘরে তুলা নিয়ে সবাই ভীষণ ব্যস্ত থাকে। বর্ষার পুরো সময় অলস কাটে সবার। গোটা পৃথিবী যেখনে আর্টিফেসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করছে সেখানে কুলুমছড়ার মানুষজন এখনো সেচের জন্য প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকে।

কৃষি কাজের পাশাপাশি অভাবে পরে অনেকে পাহাড় থেকে চোরাই পথে গরু নামায়। খাসিয়াদের কাছ থেকে পাহাড়ি বাগানের গাছ কিনে দেশে এনে করাত কলে বিক্রি করে কেউকেউ।

প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম মিশে একাকার হয়েছে কুলুমছড়ায়। এতো সংগ্রাম আর অনিশ্চিয়তার মাঝেও এখানকার মানুষজনকে দেখলে ভীষণ সুখী মনে হয়। সেই সুখের রহস্যজট খুলতে আপনিও আসতে পারেন কুলুমছড়ায়।

কুলুমছড়া আসতে হলে প্রথমে আসতে হবে সিলেট শহরে। সিলেট বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে করে প্রথমে আম্বরখানা এসে নামতে হবে। ভাড়া নেবে জনপ্রতি ৩০ টাকা। আম্বরখানা থেকে আবারও সিএনজিতে করে এসে নামতে হবে হাদারপাড় বাজার। জনপ্রতি ভাড়া ১২০ টাকা। হাদারপাড় বাজার থেকে নৌকায় করে গিয়ে নামতে হবে খেয়াঘাট। নৌকাতে জনপ্রতি ভাড়া ৩০ টাকা। খেয়াঘাট থেকে ঘন্টা খানেক পশ্চিম দিকে পায়ে হেটে এসে পৌঁছাতে হবে কুলুমছড়া গ্রামে। কুলুমছড়ায় রাতে থাকার জন্য কোন হোটেল নেই। চাইলে ক্যাম্পিং করা যাবে কিংবা স্থানীয় কারো বাড়িতে ম্যানেজ করে থাকতে হবে।

  •  সীমান্তরেখা
  •  Bangladesh
  •  কুলুমছড়া, পশিচম জাফলং, গোয়াইনঘাট, সিলেট
  •  Bus
  •  House of local people
  •  Bengali Food

0 comments

Leave a comment

Login To Comment