Image

যগি-জতলাং এর পথে পথে

যগি-জতলাং  এর পথে পথে

ঘোরাঘুরি সবসময় আমার কাছে একটা নেশার মতো কাজ করে। বিশেষ করে পাহাড়ে ঘোরা। পাহাড় আমার কাছে স্বর্গের মতো একটা জায়গা। পাহড় থেকে যখন মেঘ দেখি তখন মনে হয় মেঘের ভেলায় ভাসছি। পাহাড়ে প্রতিটি ভোরে,  প্রতিটি রাতে আলাদা এক একটি আনুভুতি কাজ করে। পাহাড়ি কোন একটা গ্রামে বসে রাতের আকাশের তারা দেখা নেশার মতো। পাহেড়ের তারা দেখা আর দুটি চুড়া সামিট করা নিয়ে আজকে গল্প।

অনেকদিনের প্ল্যান ছিলো যগি-জতলাং যাবো। যগি আনঅফিসিয়ালি বাংলাদেশের চতুর্থ উচ্চতম পাহাড়, আর জতলাং আনঅফিসিয়ালি বাংলাদেশের দ্বিতীয় উচ্চতম পাহাড়। এই দুটি পাহাড়ের অবস্থান থানচির দিকে দিয়ে বাংলাদেশ-মায়ানমার সিমান্তে। থানচিতে জগি-যতলাং ছাড়াও আরো অনেক পাহাড় আছে, অনেক ঝর্ণাও আছে। যগি-জতলাং পাহাড় দুটো কাছাকাছি হাওয়ায় আমরা এই পাহাড় দুটিততে যাবো বলে ঠিক করি। আর আমাদের কিছু ঝর্ণা দেখার প্ল্যান থাকার কারণে আমরা একটু দীর্ঘ প্ল্যান করি। সবমিলিয়ে  আমাদের প্ল্যান ছিলো ৭ দিনের। আমিয়াখুম,  নাফাখুম ঝর্ণা দুটি দেখে যগি-জতলাং পাহাড় দুটি সামিটে যাবো।  দীর্ঘদিনের প্ল্যান হওয়ার কারণে পারফেক্ট একটা টিম পেতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। বহু খোজাখুজির পর ৭ জনের একটা টিম হলাম আমরা। এর মধ্যে বেশিরভাগ নতুন ট্রেকার। নতুন হলেও পাহাড়ের প্রতি তাদের ভালোবাসা দেখে সাথে নিয়ে নিলাম। পূর্ব নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী জানুয়ারির ৩১ তারিখ রাতর ঢাকা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।  ভোর আনুমানিক ৪ টা ৩০ এর দিকে বাস আমাদের বান্দরবান নামিয়ে দিলো।পাহাড়ি অন্চলে এমনিতেই একটু শীত বেশী, তার উপর জানুয়ারি মাস।বান্দরবান  শহর থেকে থানচি যাওয়ার প্রথম বাস ৮ টায় থাকার কারণে আমাদের ৮ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। শীতের মধ্যে কাপতে কাপতে শুকনা কাঠ কুড়ানো শুরু করলাম। কাঠ কুড়িয়ে আগুন জালানোর পর সবাই যেনো স্বস্থী পেলো। অপেক্ষা করতে করতে ৮ টা বেজে গেলো।  বাসে উঠে সবাই সবার বাসায় ফোন দেওয়া শুরু করলো, কারণ থানচির পর থেকে বেশি কিছুদিন আমাদের নেটওয়ার্কের বাহিরে থাকতে হবে। ১১ টা ৩০ এর দিকে থানচি পৌছালাম। থানচিতে আমাদের আরেক টিমমেট(গাইড) হাসান অপেক্ষা করতেছিলো। সে সব কিছু আগে থেকেই মেনেজ করে রেখেছিলো তাই আমাদের এত ঝামেলা করতে হলো না। থানচি থেকে ট্রেকিং এর জন্য প্রিপারেসন নিয়ে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পরলাম পদ্মমুখের উদ্দেশ্যে। ১ টার দিকে আমরা পদ্মমুখে আসলাম। পদ্মমুখ থেকে আমরা হাটা শুরু করলাম থুইসা পাড়ার উদ্দেশ্যে। সাধারণত পদ্মমুখ থেকে থুইসা পাড়া ৫ ঘন্টার মতো লাগে। আমি এই রুটে এর আগেও কয়েকবার গিয়েছিলাম তাই রুটটা আমি চিনতাম। আমরা ৩ ঘন্টা ৩০ মিনিটে থুইসা পাড়ায় পৌছালাম। যা আমার নিজের পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে দিলো। নিজের রেকর্ড যখন নিজে ভাঙি তখন এক ভালো লাগা কাজ করে। রাস্তায় অনেক ট্রেকার ভাই-আপুদের সাথে দেখা হয়েছিলো। সবাইকে পিছনে ফেলে সনার আগে পাড়ায় পৌছালাম। থুইসা পাড়ায় দুইটা অং আছে,  একটা বড় অং, আরেকটা ছোট অং। থুইসা পাড়ায় আগে কয়েকবার যাওয়ার কারণে তাদের দুইজনের সাথে আমার খুবি ভালো সম্পর্ক। পাড়ায় যাওয়ার পর যখন দেখি কয়েকটা পরিচিত মুৃখ আমাকে দেখে বলে দাদা ভুইলা গেছো এখনতো আর এদিকে আসো না। এই কথা শুনার পর মনে হয় তারা আমাকে খুব ভালোভাবেই মনে রাখছে। যাইহোক পাড়ায় পৌছে সবাই অং এর ঘরে উঠলাম। অং আমাদের জন্য খাবার রেডি করবো। সবাই ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে নিলাম। খাবার খেয়েতো সবাই গভীর নিদ্রায় চলে গেছে। আমি তখন পাড়ায় আসা বাকি ট্রেকারদের সাথে আড্ডা দিতে লাগলাম। আমাদের পাশের রুমে চিটাগং মেডিকেলের কয়েকজন ভাই আপু উঠেছিলো, তাদের সাথে কথা বলে জানলাম তারা এসেছে রেমাক্রি হয়ে।  তাদের ৮ ঘন্টা লাগছে রেমাক্রি থেকে থুইসা পাড়ায় আসতে, সাধারণত এটি ৪ ঘন্টাও লাগার কথা না। যাইহোক টিম দুর্বল হওয়ার কারণে হয়তো এই অবস্থা। সন্ধ্যার পর আগুন জ্বালিয়ে বসলাম।  কিছুক্ষণ পর আমার টিমমেট কয়েকজন আসলো। তাদের সাথে নিয়ে তারা দেখতে চলে গেলাম পাড়ার শেষে থাকা চার্জের সামনে। চার্জের সামনে ছোট একটা ফাকা মাঠ আছে। তারার সাথে অনেকখন ছবিতুলার পর চলে আসলাম অং এর বাসার সামনে। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে সবাই ঘুমাতে চলে গেলাম। ঘুমানোর আগে সবাই মিলে পরের দিনের প্ল্যান ঠিক করলাম।
 দ্বিতীয় ভোরে ঘুম থেকে উঠে  নাস্তা করে লোকাল গাইড নিয়ে সবাই রওনা হলাম আমিয়াখুমের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় দেবতার পাহাড়ের চুড়ায় সবাই বসে কিছুখন রেস্ট নিলাম। বলে রাখা ভালো যে থুইসা পাড়া থেকে আমরা সবার আগে আমিয়াখুমের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম, কারণ সবগুলা খুম যাতে ঘুরতে পারি। দেবতার পাহাড় থেকে নেমে আমরা প্রথমেই গেলাম ভেলাখুম দেখতে।  ভেলাখুম দেখে নাইক্ষ্যং মুখে বসে আড্ডা দিয়ে আমিয়াখুম চলে আসলাম।

আমিয়াখুমের পানিতে ভরপুর গোসল করে, হালকা খাবার খেয়ে আবার রওনা দিলাম থুইসা পাড়ার উদ্দেশ্যে। দুপুরের একটু পর পর থুইসা পাড়ায় আসলাম। পাড়ায় এসে সবাই ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে নিলাম। খাবার খেয়ে সবাই ঘুমাতে চলে গেলো। আমি, হাসান আর অং বেরিয়ে পড়লাম নিচের ঝিরিতে মাছ ধরতে। ২ ঘন্টার বেশি মাছ ধরে কিছু মাছ পাওয়া গেলো। মাছ ধরতে ধরতর সন্ধ্যা ৭ টা বেজে গেছে। মাছ নিয়ে পাড়ায় পৌছে অংরে বললাম রাতের খাবারের সাথে যাতে মাছগুলা ভেজে রাখে। তারপর ফ্রেশ হয়ে টিমের বাকিদের ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। সবাই উঠার পর শুরু হলো রাতের আড্ডা। সাথে জয়েন করলো অন্য টিমের অভিযাত্রিরা। অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা,  গান চললো। এর মধ্যে টিমের অনেকেই বাসায় যোগাযোগের চেষ্টা করলো। পাড়ায় কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় বাশের উপর রেখে কথা বলতে হয়। সবার সব কাজ শেষে আমরা রুমে চলে গেলাম।  রুমে গিয়ে সবাই মিলে পরেরদিনের প্ল্যান ঠিক করলাম।ি
তৃতীয় দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সকালেন নাস্তা সাথে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম দলিয়ান পাড়ার উদ্দেশ্যে। দলিয়ান পাড়া যাওয়ার আগে নাফাখুম দেখে তারপর দলিয়ান পাড়া যাবো। রাস্তায় একটা ঝিরির পাশে সকালের নাস্তা করে নিলাম। তারপর চলে গেলাম দলিয়ান পাড়ার উদ্দেশ্যে। দলিয়ান পাড়ায় যাওয়ার জন্য উলাচিং পাড়া থেকে আমাদের একজন লোকাল গাইড নিতে হবে। লোকাল গাইড নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম দলিয়ান পাড়ার দিকে। রাস্তায় একটা জুমঘরে বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। দুপুরের দিকে পৌছালাম দিলিয়ান পাড়ায়। দলিয়ান পাড়া কারবারির ঘরে উঠলাম আমরা। দিদি আমাদের জন্য দুপুরের খাবার রান্না করলো। ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে নিলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পরলাম পাড়া ঘুরতে। সেদিন ছিলো রবিবার। রবিবার হচ্ছে দলিয়ান পাড়ার ছুটিরদিন। ওইদিন পাড়ার ছেলেরা কাজে যায় না। খেলাধুলা করে সময় পার করে। বিকালে আমরা এবং খুলনা থেকে আসা আরেকটি টিম মিলে ভলিবল খেলে সময় পাড় করলাম।

রাতে আড্ডা দিয়ে সময় পার করলাম। এবং দাদার সাথে পরেরদিন কোন গাইড আমাদের সাথে যগি যাবে সেটা ঠিক করলাম। আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম অন্ধকার থাকা অবস্থা ওয়াই জংশন পার হবো। দিনের বেলায় রোদে হাটতে কষ্ট হয়ে যায়। প্ল্যান,  গাইড সব ঠিক করে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

চতুর্থদিন রাতের অন্ধকারেই তারা দেখতে দেখতে গাইড নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম যগির উদ্দেশ্যে। ওয়াই জংশন পাড় হতে হতে দিনের আলো ফুটে গিয়েছে। ওয়াই জংশনের পরে একটা জুমঘরে সকালের নাস্তা খেয়ে রওনা হলাম যগির উদ্দেশ্যে। ১০ টার দিকে আমরা যগি সামিট করলাম।

সামিট পয়েন্ট কিছু সময় কাটিয়ে চলে আসলাম আবার সেই জুমঘরে। জুমঘরে বসে নুডুলস রান্না করলাম। নুডুলস খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দলিয়ান পাড়ায় চলে আসলাম। দলিয়ান পাড়ায় আসলাম দুপুরের দিকে। পাড়ায় এসে দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই বিশ্রাম নিলাম। সন্ধ্যার দিকে সবাই ঘুম থেকে উঠে কফির কাপ নিয়ে বসলাম। সাথে চলতে লাগলো পরের দিনের প্ল্যান ঠিক করা। যগি থেকে ফিরে আমাদের সাথে ৩ জন ঠিক করলো তারা জতলাং যাবে না। তাদের অবস্থা খারাপ। আমার ঠিক করলাম ওরা পাড়ায় থাকবে আমরা সামিট করে আসবো। সামিট করে এসে আমরা সেদিন রেমাক্রি চলে যাবো। এতে আমাদের কিছু রাস্তা এগিয়ে থাকা হবে।
৫ম দিন আমরা রাতের অন্ধকারেই গাইড নিয়ে বেরিয়ে পরলাম জতলাং এর উদ্দেশ্যে। দিনের আলো ফোটার আগেই ওয়াই জংশন পারি দিলাম। জতলাং এর রাস্তা অনেক খাড়ি হওয়ার কারণে টিমের ২ জনে অনেক কষ্ট হচ্ছিলো।

অনেক কষ্টের পর ১০ টার দিকে জতলাং পৌছালাম।

জতলাং চুড়ায় বসে বাকিদের রেখে আসা সামিট নোট পরলাম।  আমরাও কিছু সামিট নোট রাখলাম।

জতলাং থেকে দলিয়ান পাড়ায় আসতে আমাদের অনেক সময় লেগেছিলো। কারণ আমাদের টিমের দুইজন অসুস্থ হয়ে গিয়েছোলো। ২ টার দিকে দলিয়ান পাড়া পৌছাই। দলিয়ান পাড়ায় দুপুরের খাবার খেয়ে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরি।  রাতে ৭ টার দিকে আমরা রেমাক্রি পৌছাই। রেমাক্রি পৌছে সবাই ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরি।

৬ষ্ঠ দিন আমাদের রিলাক্স ডে। সকালে দেরি করেই ঘুম থেকে উঠি। সকালে ঘুম থেকে উঠে নুডুলস রান্না করলাম। নুডুলস খেয়ে সবাই চলে গেলাম নদিতে গোসল করতে। নদিতে গোসল করে নৌকায় করে থানচির উদ্দেশ্যে রওনা দেই। থানচি থেকে গাইডকে বিদায় দিয়ে আমরা বান্দরবানের বাসে উঠে পরি। সন্ধ্যার দিকে বান্দরবান শহরে এসে পৌছাই আমরা। বান্দরবান শহরে এস খেয়ে দেয় ঢাকার বাসে উঠে পরি। 

  •  যগি-জতলাং
  •  Bangladesh
  •  বান্দরবান
  •  Bus
  •  পাহাড়ি কটেজ(প্রতি রাতে ১৫০)
  •  প্রতি বেলা খাবার(১৫০)
  •  গাইড(৬ দিনে ৪৫০০)

0 comments

Leave a comment

Login To Comment