Image

খুলনায় কুপোকাত

রাতের বাসে খুলনা যাওয়ার আগেই শুনি বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘ফনি আমি সারাজীবন ঢাকায় বড় হওয়া ছেলেএমন বড় ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমার ধারণা কম আমার ‘অ্যাডভেঞ্চারাস’ মন নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দিলাম আরেক বন্ধুর বাড়ি গন্তব্য– বেজেরডাঙ্গাফুলতলাখুলনা

সকাল বেলা যখন বাস থেকে নামলাম তখন ভেপসা গরম গ্রাম বাংলার মানুষ মাত্রই সহজ সরল কিন্তু খুলনার মানুষজন বোধয় আরেক কাঠী বেশি বাস থেকে নেমেই আমরা এক মোটরচালিত ভ্যান খুঁজছিলাম বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য খুলনায় অল্প রাস্তা যাওয়ার জন্য রিক্সা থেকেও এই ভ্যান বেশি ব্যাবহার হয় ভোরবেলা বাসস্ট্যান্ডে তেমন কেউ নেই এক ভ্যানচালককে মাত্রই জিজ্ঞেস করতে যাব যে তিনি যাবেন কি না ? কিছু বলে ওঠার আগেই ধবধবে সাদা দাড়িওয়ালা ষাটোর্ধ ভদ্রলোক হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আসসালামুয়ালাইকুমআপনারা ভালো আছেন?‘ মনে হয় কত দিনের চেনাপরিচয় আমি সম্পূর্ণ অচেনা শহরেঅচেনা এক ভ্যানচালক এর এই প্রশ্নএই ব্যাবহারের জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না খুলনার প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মায় ঠিক তখন থেকেই

আমরা যেখানটায় থাকবসেই জায়গাটা মুল খুলনা শহর থেকে একটু দূরে ‘ভৈরব’ নদীর কোল ঘেঁষে বাড়ির জানালা দিয়ে নদী দেখা যায় মাঝে বিশাল সর্ষে ক্ষেত আমরা দুপুরের খাওয়ার পরেই নদীর ধারে গেলাম। নিয়মিত নৌকা চললেও ‘ফণী কারনে কোন নৌকা নেই। আবহাওয়া দেখে তেমন কিছু আঁচ করা না গেলেও মানুষের মধ্যে কেমন যেন একটা চাপা ভয় বোঝা যাচ্ছে। খবর শুনে মনে হল কালকে বিকালের পরে ঘর থেকেও হয়ত বের হওয়া যাবেনা। তাই আমরা আশেপাশে ঘুরতে লাগলাম। নিউ মার্কেট গেলাম টুকটাক কেনাকাটা করতে। ঢাকার নিউ মার্কেট এর মতনই প্রায়। তবে আমার কাছে আরও অনেক বেশি প্রশস্ত আর পরিচ্ছন্ন মনে হল। রাতে গেলাম খুলনার বিখ্যাত ‘চুইঝালের গরুর মাংস’ খেতে প্রসিদ্ধ ‘মুসলিম হোটেলে চুই আসলে একরকম গাছের বাকল। বেশ ঝালতবে কিছুটা ভিন্ন রকমের ঝাল। বাংলাদেশের অন্য সবজায়গার মতন খুলনার রান্নাতেও একটা স্বকীয়তা আছে। এখানে আমি প্রথম দেখলাম গোটা রসুন সিদ্ধ করে তরকারীতে দিয়ে দেয়। তাই তরকারীতে রসুনের মিষ্টি একটা ঘ্রান থাকে।

পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি আকাশ মেঘে ভারি হয়ে আছে। বাড়ি থেকে বের হতেই দেখি ছোট অটোরিক্সাগুলোতে করে মাইকিং হচ্ছে ঝড়ের পূর্বাভাস নিয়েসবাইকে সতর্কতার সাথে চলাচল করতে বলা হচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। পুরো খুলনা শহরে কারেন্ট নেই। বৃষ্টিতে গ্রামের মাটির সোঁদা ঘ্রান আর কুপির পোড়া তেলের গন্ধের জন্যই তো ছুটে আসা এত দূর।

 ভাগ্যক্রমে ঝড় তেমনভাবে আঘাত করেনি। তাই পরেরদিন আমরা যাই রূপসা নদী দেখার জন্য। ঝড়ের শঙ্কা কেটে গেলেও আকাশে তখনও মেঘ আর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। মাঝারি আকারের নৌকায় দুই মাঝি সহ আমরা মোট ছয়জন। দূরে ছোট ছোট জাহাজ দেখা যায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক নৌকা চলার পরে মাঝি এক জনমানবশূন্য চরে নৌকা ভেড়াল। খুব বেশি বড় ‘চর’ না। চরের মাঝখানে দাঁড়ালে দুপাশেই নদী। কিছুটা ভয় আর কিছুটা আনন্দ গ্রাস করে আমাদের।

মংলা পোর্ট আর সুন্দরবনের হাতছানিকে পেছনে ফেলেই ঢাকা ফেরত আসতে হয় থেকে যাওয়ার ব্যাকুলতা থাকে বলেই হয়ত আবার কখনও ফিরে আসব

0 comments

Leave a comment

Login To Comment