Image

হাওরের মুগ্ধতা ও একটি ভয়ের গল্প

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হবার পরই বন্ধুদের সাথে ট্যুরে যাবার অনুমতি পাই বাসা থেকে। দ্বিতীয় বর্ষের কথা, সবাই টাঙ্গুয়ার হাওরের ঘুরতে যাচ্ছে। আর আসার পরই সবার মুখে একটাই কথা “জীবনে একবার হলেও টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়া উচিত, অসাধারণ জায়গা”।

তো আমরা ৭ জন বন্ধু প্ল্যান করে ফেললাম অসাধারণ এই জায়গা দেখার জন্য।

রাত ১২ টার বাসে উঠে বসলাম আমরা। যাচ্ছি সুনামগঞ্জ। সকাল সকাল পৌঁছে গেলাম আমরা। নেমেই কাছে একটা হোটেলে নাস্তা করে নিলাম। টাঙ্গুয়ার হাওর এখনও বেশ দূরে। চেপে বসলাম লেগুনা তে, নিয়ে যাবে তাহিরপুর। আর সেখান থেকেই আমাদের নৌকা ভাড়া করতে হবে। ২ ঘন্টা পর পৌঁছের গেলাম তাহিরপুর। নেমেই বেশ জমজমাট এক বাজার দেখলাম। আমরা আগে চলে গেলাম নৌকা ঘাটে, পছন্দ মতো একটা নৌকা ঠিক করে ফেললাম। সারাদিন ঘুরে টেকের ঘাট নামে একটা জায়গা তে নোঙর করবে, রাতে সেখানেই নৌকাতে থাকবো। তারপর আমরা কয়েকজন বাজার করতে চলে গেলাম, কারণ রান্নাবান্না সব নৌকাতেই হবে। মাঝিরা রান্না করবে। আর তাদের হাতের রান্না নাকি অসাধারণ স্বাদ। চাল, ডাল, মুরগি, মসলা ইত্যাদি কিনে রওনা দিতে প্রায় ১২টা বেজে গেলো। 

শুরু করলাম যাত্রা। প্রথমে আশেপাশের দৃশ্য দেখে বেশ সাধারণ লাগছিল। একটা বড় জলাধার যেমন কল্পনা করা যায়, তেমন ই। ঠিক ২০ মিনিট আগানোর পর আস্তে আস্তে রূপ বদলানো শুরু হলো, আর আমার বাইশ বছরের জীবনে আমি এমন বিশাল আর খোলামেলা ভাবে আকাশ আর দেখিনি। তখন আবহাওয়া কিছুটা মেঘলা ছিল, দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল আর ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। আমরা সবাই নৌকার ছাদে শুয়ে পড়েছিলাম। কেউ কোনো কথা বলছিলাম না কিন্তু সবার চেহারায় দেখতে পাচ্ছিলাম একটা শান্তির আভা। এমন আরাম করে আগে কখনো শুয়ে ছিলাম বলে মনে পড়ে না আমার।

নৌকা চলছে। প্রায় ১ ঘন্টা যাবার পর আস্তে আস্তে মেঘ সরে যেতে লাগলো, এরপর মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই ঝকঝকে নীল আকাশের দেখা মিল্লো। গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘরাশি একদম তুলার মত দেখাচ্ছিল। পানিতে তাকিয়ে মনে হচ্ছিলো যেন বিশাল এক আয়না। আর তখনই মনে হচ্ছিলো আসলেই টাঙ্গুয়ার হাওরে জীবনে একবার হলেও আসা উচিত। 

এরই মধ্যে মাঝিরা নৌকাতে রান্না শুরু করে দিলো। বেশ সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছিলো, ক্ষুধা যেনো আরও বেড়ে যাচ্ছিলো। দুপুর ৩ টার দিকে আমরা খেতে বসে গেলাম। মেনু ছিল ভাত, আলু ভর্তা, মুরগির মাংশ আর ডাল। আগেই মাঝিদের রান্নার প্রশংসা শুনেছিলাম, খাবার সময় বুঝলাম সেটা এক বিন্দুও মিথ্যা নয়। খাওয়া শেষে হাওরে ঝাপাঝাপি শুরু হলো।

পড়ন্ত বিকালে পৌছে গেলাম টেকেরঘাট। এখানে নৌকা বাধা থাকবে, রাতে নৌকাতেই থাকবো।   

সে সময়টাতে সুর্য ডুবি ডুবি করছে, আকাশে হলুদ-গোলাপি আভা ফুটে উঠেছে, পাখিরা তাদের ঘরে ফিরে যাচ্ছে, মাঝিরা নৌকা নিয়ে পাড়ের দিকে আসছে, সবকিছু মিলিয়ে দৃশ্যটা অসাধারন লাগছিল। আর খুবই গর্ব হচ্ছিলো যে এমন একটা জায়গা বিদেশের কোথাও না, আমার নিজ দেশ বাংলাদেশে! 

এখন আসি কিভাবে এই গর্বের অনুভুতিটা একদম ধুলিস্যাত হয়েছিল পরদিনই! রাতে আমরা খেয়ে নৌকার ছাদে গিয়ে বসলাম। চাঁদ উঠেছে। সবাই গল্প করলাম। চাঁদের আলোতে আবছা ভাবে সবার মুখ দেখা যাচ্ছিল। অসাধারন লাগছিল মুহুর্তগুলো। 

কিছুক্ষনের মধ্যেই দেখলাম মেঘ জমছে আকাশে, আর তার ১৫ মিনিটের মধ্যেই শুরু হলো ঝড়। আমরা তাড়াহুড়্রা করে নৌকার ভিতরে চলে গেলাম। বেশ ভালো লাগছিল, বাইরে ঝড় আর আমরা গল্প করছি। গল্প করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই। 

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল খুট খুট শব্দে। হঠাৎ করে বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে। শুয়েই সামনের দিকে তাকালাম, স্পস্ট দেখলাম একজন লোক আমাদের ব্যাগ যেদিকে রাখা সেখানে। ব্যাগ খুলার শব্দই পাচ্ছিলাম। হঠাৎ এটা দেখার পর কি হয়েছিলো আমি জানি না কিন্তু আমি কথা বলতে পারছিলাম না। চিৎকার করার চেস্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। আমার পাশের জনকে ধাক্কা দিলাম আস্তে করে কিন্তু উঠাতে পারলাম না। কিছুক্ষন এভাবেই যাওয়ার পর সব শক্তি নিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। সবাই হুড়মুড় করে উঠে পড়লো আর সে লোকটা লাফিয়ে খোলা দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলো। সবাই হঠাৎ কিছু বুঝতে পারছিল না তাই পিছু নেওয়াও সম্ভব হয়নি।

৫টা মোবাইল, ২টা মানিব্যাগ আর স্বপ্নময় ট্যুরটার আনন্দ গুলো নিয়ে পালিয়েছিল চোরটা!

  •  A Trip to Tanguar Haor
  •  Bangladesh
  •  Tanguar Haor
  •  Boat/Launch
  •  500/person
  •  600/person

0 comments

Leave a comment

Login To Comment