Image

হাওড়ের দেশে একদিন

ভ্রমণ প্রিয়দের জন্য ছুটির দিনগুলো আশির্বাদের মতো! আর যদি ঈদের ছুটি হয় তবেতো কথাই নেই। গত রমজানের ঈদের পরের দিন সিদ্ধান্ত নিলাম হাওড় দেখতে যাব। লৌহিত্ব তীরের সন্তান আমি জলের প্রতি আমার আবেগ ভালোবাসা টান বরাবরই একটু বেশি।মৃদু কিংবা ঝড়ো হাওয়ায় ঢেউদের মতো আমার মনেও শিহরণ জাগে জলের মুগ্ধতায় বিলীন হতে। হারিয়ে যেতে অসীম জলরাশির বিন্দুতে। অন্তহীন পথে বয়ে চলা স্রোতের গান শুনতে।

  

ঈদের দিনের দীর্ঘ বিকেল,সন্ধ্যা ও মধ্যরাত বাইরে কাটিয়ে ভোর রাতে আবারো সারাদিনের সফরে বেরিয়ে পড়া রীতিমতো কঠিন একটা কর্ম বটে! গৃহিণীর অভিযোগ অভিমান আর সদ্য প্রস্ফুটিত সন্তানের মায়াময় মুখয়াবব অগ্রাহ্য করে ঠিক ছয়টায় চেপে বসলাম মোহনগঞ্জগামী লোকাল ট্রেনে। গন্তব্য স্নেহভাজন ছোট ভাই দেলোয়ার হুসাইন অপুদের বাড়ি বেরানো। রথ দেখার সাথে হাওড় অবগাহন ফ্রি।

 

ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে সিলেটের সুনামগঞ্জ! দীর্ঘ পথের যাত্রা শুরু হলো ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ধারণক্ষমতার ১০-১২ গুণ যাত্রী বুঝাই করে। নেত্রকোনা পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা ১৫-১৮ গুণে পৌছালো! আমরা তখন শুধুমাত্র একটু ভালো করে দাড়ানোর জায়গা খুজছিলাম! আমিওয়ালিউল ইসলাম ও জাকির উসমান , আমার প্রিয় দুই ভাগিনা-বন্ধু

মোহনগঞ্জ থেকে রিক্সায় সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলারধর্মপাশা উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে। সুনামগঞ্জ জেলাকে সমৃদ্ধ করেছে বাংলাদেশের বিক্ষাত সকল হাওড়-বাওড়। একেকটার পরিধিবিস্তৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রেমিক মনকে বারবার বিমোহিত করে। আত্মার খোরাক জোগায়। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ হৃদয় সিজদাবনত হয়।

অপু আমাদের অভিন্ন হৃদয়। ঠাণ্ডা কাগুজি লেবুর শরবত দিয়ে আমাদের স্বাগত জানালো। অল্প কিছুদিন আগে অপুর আম্মা গত হয়েছেন। অপুর পরিবারের ঈদ মূলত আমরা আসার পরই শুরু হলো। আমাদের আসার এটাই বড় কারণ। মা নাথাকায় বাসার আপ্যায়নের যাবতীয় আয়োজন অপুর আব্বা নিজ হাতে সম্পন্ন করেছেন! হাওড়ের তাজা কাইকা মাছশোল মাছটেংরা মাছহাঁস ভুনাগরুর গোশতকালিজিরা চালের পোলাও ও সাদা ভাত। সব নিজেই রান্না করেছেন। অসাধারণ সেই রান্নার ঘ্রাণ স্বাদ। দাঁতকে নিস্তার দিইনি। পাকস্থালী বিদ্রোহ করা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলছে চলবে।হাওড়ের পানির প্রভাব এর আশপাশের মানুষকেও আদ্র করে রাখে সবসময়। এঁদের অতিথিপরায়নতা, শীতলতা আচরনের নম্রতা কাছে গেলেই অনুভব করা যায়।মায়াময় মমতায় জাড়িয়ে রাখে আপন পর সবাইকে।  

নাস্তা সেরে সনই হাওড় দেখতে অটো যাত্রা।সৈয়দপুর গ্রাম থেকে প্রায় ৪৫ মিনিটের অটো যাত্রা শেষে গন্তব্যে পৌঁছে কিছুটা হতাশ হলাম। আকাশ জোড়ে তখন তীব্র দ্রোহের তাণ্ডব! ছাতি ফাটা রোদে দাড়ানোর উপায় নেই। স্পিডবোটে হাওড় দেখার ইচ্ছে ছিল অথচ হাওড়ে একটা বেড়ানোর মতো একটা ছোট ডিঙিনৌকাও নেই! একটা টং দোকানে প্রায় বিনামূল্য ডাব পাওয়া গেলো! ঢাকার বাজারের ৭০/৮০ টাকা দামের ডাউস ডাব মাত্র ২০ টাকা! তীব্র রোদে হৃদয়ে শীতলতা দান করলো এই অমৃত জল। হাওড়ের মানুষের মতই এর স্নিগ্ধটা । সনই ব্রীজে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম হাওড়ের বিশালতা। ডানে, বায়ে সামনে পেছনে শুধু পানি আর পানি। মাঝেমাঝে দূরে দেখা যায় কিছু বাড়িঘর গাছপালা । দেখে মনেহয় যেন জলের ভেতর ভেসে আছে।ব্রিজের গোঁড়ায় একটা বড় মাছের নৌকা। কিছুক্ষণ পর পর ছোট নৌকায় করে স্থানীয় জেলেরা মাছ নিয়ে আসছে আর পাইকার তাঁদের থেকে কিনে ছোট ছোট বক্সে সংরক্ষণ করছে মাছ। সারাদিন মাছ জমা হয়ে রাতের ট্রাকে চলে ছড়িয়ে পরবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।  

ফিরে আসলাম বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের কাছে। ছোট ডিঙি নৌকায় বিশ্রামরত একজন চাচাকে পেয়ে গেলাম। ঠায় নাই ঠায় নাই ছোট সে তরী! কোনরকম তিনজন উঠার পর নৌকা আর বিস্মৃত জলের মাঝে ফরাক রইলো মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার। আসমানির ঘরের মতো এই বুঝি ডুবে যায়! নৌভ্রমণের ইতিহাসে সবচেয়ে আনন্দপূর্ণ যাত্রা আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ তা বুঝতে কয়েক মিনিট লেগে গেলো। স্বচ্ছ অগভীর পানির নিচের ভাসমান নানান জলজ উদ্ভিদের এক মহাসমুদ্রে প্রবেশ করলো আমাদের ছোট্ট টাইটানিক।আস্তে আস্তে নৌকা গভীর হাওড়ে পৌছালো। চার দিকে যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। মৃদু বাতাস বইছে। স্তব্ধ নিরবতায় ঢেউয়ের মৃদু ব্যঞ্জনা। মৃদু দুলোনিতে নৌকায় ছিটকে ছিটকে পানি উঠছে আর গা শিউরে উঠছে। নৌকার পরিধি নিতান্তই ছোট হওয়ায় খুব বেশিদূর যাওয়া গেল না। বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের মাঠে পৌঁছে আমাদের আতি সংক্ষিপ্ত অথচ তৃপ্তিদায়ক ও চিত্তাকর্ষক এই সফর শেষ হলো। বিস্মৃত হাওড়ের বুকেচিরে আসীম পাড়ি দেয়ার একটা তাড়না মনের গভীরে অজান্তেই রেখাপথ করেছিল ফলে আব্দুল হাই স্যার যখন ট্রলার চেপে হাওড় পাড়ি দেয়ার প্রস্তাব দিলেন তখন সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম।

বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল হাই স্যার। অপুর শিক্ষা গার্জিয়ানঅনুপ্রেরণা । ঈদের পর দিনই একজন পিয়নকে নিয়ে অফিস করছেন! আব্বার ছাত্র ছিলেন। ১৯৮৬ /৮৭ সালে নাসিরাবাদ মহাবিদ্যালয় কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করেছেন। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন স্নেহ ও ভালোবাসার সাথে। ট্রলার ভাড়া করে আমাদের নিয়ে হাওড়ের সীমানা খুঁজতে বেরোলেন।

শৈলচাপড়া হাওড় ।সুনামগঞ্জের বাদশাগঞ্জ বাজার ছুঁয়ে চলে গেছে প্রায় সীমানা রেখা পর্যন্ত!এর একমাথা গিয়ে মিশেছে সনই হাউরের সাথে যা আরো বিস্তৃত হয়ে বিখ্যাত টাঙুয়ার হাওড়ে মিলে-মিশে একাকার হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসে ঢলের পানির সাথে বৃষ্টির পানি মিলে সয়লাব মাইলকে মাইল ফসলি জমি। বাড়িপাড়া অনেক গ্রামও পানিবদ্ধ হয়ে আছে। যতদূর দেখা যায় পানি আর পানি। কেমন আছেন পানিবদ্ধ পরিবার গুলো! দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও পানির কোন সীমানা পাওয়া গেলনা অগত্যা ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। মাঝিভাই ট্রলারের মাথা ঘুরিয়ে বাদশাগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের মাঠের দিকে রওনা হলেন।

এবার ময়মনের পথে ফেরার পালা। অপুদের বাড়িতে আরেকবার জবরদস্ত খানা-পিনা হলো। বিদায় জানালেন অপুর নানিআব্বা আর হাই স্যার। অপুর বন্ধুরা সবাই এসেছিল। আমাদের সাথে দীর্ঘসময় ছিলতাদের জন্য ভালোবাসা। সিএনজি যোগে নেত্রকোনা হয়ে ময়মনসিংহ।

নদীতীরের ছেলে আমি। জলের জন্য আলাদা একটা টান সব সময়ই আমাকে ব্যাকুল করে রাখে। ফলে পানির যে কোন আহ্বান আমি হেলায় হারাতে অক্ষম।

গতকাল থেকে একটা লাইনই বারবার কানে বাজছে –
তোমার সৃষ্টি যদি হয় এতো সুন্দর! তাহলে না জানি তুমি কত সুন্দর….. ।

 

যেভাবে যাবেন- গাবতলি বা সায়দাবাদ টার্মিনাল হতে বাসে সুনামগঞ্জ । সুনামগঞ্জ থেকে লেগুনা, অটোরিক্সা বা মোটর সাইকেলে বাদশাগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ। কলেজের মাঠের পাশেই নৌকা/ ট্রলার পাবেন। দরদাম ঠিক করে উঠে পড়ুন।যদি রাতে নৌকায় থাকতে চান তবে তার ব্যাবস্থাও আছে। ভাড়া একটু বেশি লাগবে। খাবারের জন্য খুব ভালো হোটেল পাবেন না তাই সাথে খাবার নিয়ে যাওয়াই ভালো।

 

সতর্কতা-সাতার না জানলে সাথে লাইফ জ্যাকেট রাখুন আর ট্রলারে হৈচৈ না করে নীরবে হাওড়ের নীরব সৌন্ধর্য উপভোগ করুন। আমরা সব সময় অসচেতন ভাবে খাবারের অপচনশিল প্যাকেট যেমন চিপস, চানাচুর, বিস্কিটের প্যাকেট। কোল্ডড্রিংসের বোতল ইত্যাদি পানিতে ফেলে দেই যা ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে।হাওড়ের সৌন্ধর্য নষ্ট হয় এমন কোন কাজ থেকে বিরত থাকুন।     

 

 

 

  •  হাওড়ের দেশে একদিন
  •  Bangladesh
  •  শৈলচাপড়া হাওড়, সুনামগঞ্জ , সিলেট
  •  Bus
  •  হাওড় ভ্রমণের জন্য ১/২ দিনই যথেষ্ট।মোটামুটি ২৫০০-৩০০০ টাকার মধ্যেই ভালভাবে ভ্রমণ করতে পারবেন।
  •  খাবারের ভালো হোটেল নেই তাই খাবারের আয়োজন নিজেরা করে নেয়াই ভালো হবে।

0 comments

Leave a comment

Login To Comment