Image

কুয়াকাটায় দুইদিন

একদিকে সুউচ্চ ঢেউগুলি সৈকতে আছড়ে পড়ে জানান দিচ্ছে সাগরের চিরযৌবনের কথা, অন্যদিকে ঝাউবনগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রাতের আঁধার চিড়ে এই সাগর থেকেই যেন জেগে উঠে সূর্য, আর দিন ফুরোলে সাগর যেন আস্ত সূর্যটাকেই গিলে খায়। সাগরের বুকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের অসাধারণ দৃশ্যের আর স্থানীয় মানুষগুলোর জীবিকানির্বাহ যেন নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয় মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ককে।
কথা বলছিলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটাকে নিয়ে।বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালীর অন্তর্গত ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘের সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা। এটি দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সমুদ্রসৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। কিছুদিন আগে আমরা সপরিবারে কুয়াকাটা থেকে ঘুরে আসি।
 
সেটি ছিল ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর। রাত সাড়ে এগারোটায় মানিকগঞ্জ জেলা বাসস্ট্যান্ড থেকে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। কুয়াকাটা যাওয়ার বিভিন্ন রকম উপায় রয়েছে- জাহাজে করে এবং বাস বা গাড়িতে করে। আমরা গিয়েছিলাম বাসে করে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষ যারা, তারা তো জানেনই ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালি রুটে সাকুরা পরিবহনই সেরা। এসিবাস ভাড়া জনপ্রতি ৯০০টাকা (ঢাকা-কুয়াকাটা). আমরা ছিলাম চারজন। আমার সাথে ছিলেন বাবা, মা আর বড়বোন। যাইহোক, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে পাটুরিয়া ফেরি ঘাট পর্যন্ত নির্বিঘ্নে আসার পর শোনা গেল প্রচণ্ড কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ- সকালের আগে তা চালু হবে না। অগত্যা, সকাল হওয়ার অপেক্ষায় বসে রইলাম বাসে। ফোনে গান শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেও জানি না।
ঘুম থেকে উঠেও শুনি, বাস মাত্র সামান্যপরিমাণ এগিয়েছে। অপেক্ষা করতে করতে শেষপর্যন্ত ৩০ তারিখ দুপুর ৩টার দিকে আমরা ফেরি পারাপার হলাম। এরপর অবশ্য আর কোন সমস্যা হয় নি। একসময় দক্ষিণবঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে অসম্ভব কষ্ট করতে হতো। বেশ কয়েকটা ছোটবড় ফেরি পারাপার হতে হতো। তবে এখন ফেরির স্থানে ব্রিজ হওয়ায় সময় অনেকাংশেই সময় সাশ্রয় হচ্ছে। পাটুরিয়া- দৌলতদিয়া ফেরিরুটের পর পটুয়াখালী এসে শুধু লেবুখালী নামে ছোট একটা ফেরি পার হতে হয়েছিল।
প্রায় ২৪ ঘন্টার দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বাসভ্রমণের পর অবশেষে আমরা কুয়াকাটা এসে পৌঁছাই ৩০ তারিখ রাত ১১টায়। অবশ্য ফেরি পারাপারের কষ্টকর অভিজ্ঞতা ছাড়া জার্নির বাকি অংশ চমৎকার ছিল। বরাবরই নতুন নতুন পরিবেশ, মানুষ- এদের দেখতে আমার ভালো লাগে। যাইহোক, কুয়াকাটার পর্যটন মোটেল এন্ড ইয়ুথ জোনে আগে থেকেই দু’টো রুম বুক করা ছিল। সেদিন রাতে আর সমুদ্র দেখতে যাওয়া হলো না। এত লম্বা ভ্রমণের পর বিছানায় শোয়ার সাথে সাথেই ঘুম!
 
পরের দিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর। সকাল থেকেই আমরা ঘোরাফেরা করার তোড়জোড় শুরু করি। সমুদ্র দেখা তো আমাদের প্রধান লক্ষ্য, তবে এছাড়াও সেখানে বেশকিছু চমৎকার জায়গা আছে দেখার মত। কুয়াকাটায় বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পটে যাওয়ার জন্য রয়েছে ভ্যানগাড়ি আর মোটরসাইকেল। শহর থেকে দূরের স্পটে যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলই একমাত্র সম্বল। কুয়াকাটায় প্রচুর মোটরসাইকেল দেখা যায় আর ভাড়ার বিনিময়ে মোটরসাইকেলে করে ট্যুরিস্টদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায় মোটরসাইকেল চালকেরা। সেই গাইডদের দুইজনকে ভাড়া করে কুয়াকাটা দেখতে বের হলাম।
রাস্তা ছেড়ে মোটরসাইকেল সৈকতে নেমে আসার আগেই দেখতে পাচ্ছিলাম সাগর। সাগরের একদম পাশ দিয়ে সৈকতের উপর মোটরসাইকেল চালানোর সময় যে অসাধারণ অনুভূতি হচ্ছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। যেহেতু দীর্ঘ ভ্রমণে প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম আর দেরি করে বের হয়েছি হোটেল থেকে, তাই সেদিন আর সূর্যোদয় দেখা হয় নি। আমরা সরাসরি চলে গেলাম কুয়াকাটা ইকোপার্ক দেখতে। ইকোপার্ক আসলে চমৎকার করে সাজানো একটি পার্ক- ঝাউবনের মাঝে দিয়ে পায়ে হাঁটা রাস্তা একদম সৈকতের পূর্বদিকে চলে গেছে। সেখান থেকে ঘুরে আমরা গেলাম কাউয়ার চর দেখতে। কাউয়ার চর যেতে একটি ছোট খাল পার হতে হয়। খালটি কুয়াকাটার পূর্ব দিক থেকে এসে পশ্চিমে সাগরে মিশে গেছে।
যাইহোক, কাউয়ার চরে আছে কয়েকধরণের ম্যাংগ্রোভ গাছ- কেওড়া, গেওয়া, কেয়া- এধরণের। আর অন্যপাশে আছে ঝাউগাছ। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল মাছধরার ট্রলার। তখন বাজে প্রায় ১১টা। গাইডরা আমাদের জানিয়ে রাখলো এই ট্রলারগুলো ভোরে সূর্যোদয়ের আগে বের হয়ে পড়ে সাগরে, আর ফিরে আসে এই সময়ে। কাউয়ার চর থেকে থেকে অতিথিপাখির চর আর লাল কাঁকড়ার চরে ঘুরতে গেলাম। সেখানে অবশ্য তেমন কিছু দেখার নেই। লাল কাঁকড়া নিরিবিলিতে থাকতে পছন্দ করে, তাই টুরিস্টদের আগমনের শব্দে তারা গর্তে লুকিয়ে পড়ে। অতিথি পাখিরাও তাই একটু বেলা হলে আর তেমন আসে না। অতিথিপাখি-লাল কাঁকড়ার দ্বীপ ঘুরে এরপর গেলাম গঙ্গামতির চরে যেখানে একপাশে রয়েছে সবুজ বনের সমারোহ আর অন্যপাশে রয়েছে সাগর। বনের সবুজ আর সমুদ্রের নীল এই দুই মিলে এক অসাধারণ মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়, এই পরিবেশ যে কোন ভ্রমণকারীর মন আন্দোলিত করবে। গঙ্গামতির চরে বেশ কিছু সময় থেকে ঝাউবনে গেলাম। দু’পাশের সারিসারি ঝাউবন দেখে মন আরো ভালো হয়ে গেল। এরপরের উদ্দেশ্য মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধবিহার দেখা। সৈকত থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে এই মিশ্রিপাড়াতে রয়েছে ৩ তলা সমপরিমাণ উচ্চতার আরেক বৌদ্ধমূর্তি। মিশ্রিপাড়া আসলে রাখাইন পল্লি, পাশেই রয়েছে একটি বাজার। রাখাইনদের তৈরি নানারকম হাতের কাজের জিনিস পাওয়া যায় এখনে। মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধবিহার দেখে মোটরসাইকেল করে গ্রামের মেঠোপথ ধরে এরপর আরেকটি বৌদ্ধমন্দির দেখতে যাই। মন্দিরটির নাম সীমা বৌদ্ধবিহার। এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে কুয়াকাটার সেই বিখ্যাত কুয়াটি। জনশ্রুতি আছে এই বিশাল কুয়ার জন্যই জায়গাটির নাম হয়েছে ‘কুয়াকাটা।’ পাশেই আছে আরেকটি রাখাইন মার্কেট। কেনা-কাটা যা করার এখান থেকেই করে ফেললাম। এখানে রয়েছ অসম্ভব সুন্দর সব তাঁতের কাজ আর বার্মিজ আচারের পসরা। দু’টো বৌদ্ধমন্দির দেখে আমরা এরপর দুপুরে ফিরে আসি হোটেলে।
 
পর্যটন মোটেলের রেস্টুরেন্টেই দুপুর এবং রাতের খাবারের ব্যবস্থা ছিল। হোটেলটির খাবারদাবারের মান এবং পরিবেশ বেশ ভাল। খাওয়াদাওয়া করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকালবেলা আবার বের হলাম। এবারো সাথে আগের গাইড। তাদের সাথে আগেই সারাদিন ঘোরাঘুরি করার কন্টাক্ট ছিল। সুতরাং আর দেরি না করে আবার বাইকে চেপে বসলাম। এবার টার্গেট কুয়াকাটার পশ্চিমাংশ দেখতে যাওয়ার। সব শেষে সাগরের বুকে সূর্য ডুবে যাওয়া দেখে ফিরে আসব।
যেখান থেকে সবচেয়ে সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা যায়, সে জায়গাটার নাম লেবুর চর বা লেবুর বন। বিকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছিলাম লেবুর চরে। সাগরের বুকে সূর্যাস্ত দেখে হঠাৎ মনে হলো, আমাদের দেশটা আসলেই অসম্ভব সুন্দর। কত চমৎকার ভবিষ্যৎ আমাদের পর্যটন শিল্পের! সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ঝিনুক কুড়ানো আর বালিতে নিজের নাম লেখা তো ছিলই। সাথে ছিল সাগরের পানিতে লাফালাফি আর সূর্যাস্তের ছবি তোলা। সমুদ্রের বিশালতায় হারিয়ে গিয়ে নিজের মনের সংকীর্ণতা দূর করার জন্য এমন একটি পরিবেশ দরকার, যখন সাথে থাকবে কেবল নিজের অতীত, বিবেক ও আত্ব উপলব্ধি, এমনই একটি জায়গা এই কুয়াকাটা। এখানে এসে সত্যিই যেন সাগরের বিশালতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।
 
 
[লেবুর চরে সূর্যাস্ত]
 
 
 
লেবুর চর থেকে কুয়াকাটার একদম পশ্চিমে যখন এলাম, আকাশে সূর্যের লালীমাও প্রায় মুছে গেছে। এ জায়গায় রয়েছে একই সাথে তিনটি নদীর মোহনা। মহীপুর, আলীপুর আর আন্ধারমানিক- এই তিন নদীর মোহনা।
জায়গাটা অসাধারণ। প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস আর পানির ঢেউয়ের শব্দে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এখান থেকে সুন্দরবনের পূর্বাংশ ফাত্রার চর দেখা যায়। সময়ের অভাবে ফাত্রার চরে যাওয়া হয় নি। তবে কেউ যদি সুন্দরবন দেখতে চান, তাহলে পুরো একটা দিন হাতে রাখতেই হবে। লঞ্চে করে যাওয়া যায়। যেতে প্রায় ঘন্টাতিনেক সময় লাগবে। সকালে লাল কাঁকড়া দেখা যায়নি। তবে ফিরে আসার পথে সৈকতে দেখি শতশত লাল রঙের কাঁকড়া দৌড়াদৌড়ি করছে। লেবুর চরে কিছু দোকান আছে যেখানে চিংড়ি, কাকড়াসহ বিভিন্ন রকমের সামুদ্রিক খাবার পাওয়া যায়। এখানকার সব কিছুই যথেষ্ট টাটকা। সূর্যাস্ত দেখে ফিরে আসার পথে টাটকা গলদা চিঙড়ির ফ্রাই আর ডাবের পানি দিয়েই বিকালের নাশতা সারলাম।
 
অনেক ইচ্ছা ছিল শুঁটকি পল্লি, ঝিনুক পল্লি দেখতে যাওয়ার, সময় স্বল্পতার জন্য সম্ভব হয় নি। হয়ত আরো ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারতাম এখানকার মানুষের জীবনধারা। তবে যতটুকু ঘুরে দেখেছি, আমার কাছে মনে হয়েছে এখানকার মানুষ এখনো অনেক সৎ এবং তারা জানে, তাদের জীবিকানির্বাহের সাথে এই টুরিস্ট স্পট ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই তারাও এই স্পটটির সৌন্দর্য রক্ষায় সমান সচেতন। যে গাইডদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলাম, তারাও আমাদের এ বিষয়ে অনেককিছু বললেন।
পরের দিন জানুয়ারির ০১ তারিখ। ২০১৮ সালের প্রথম দিন। খুব ভোরে আমরা ঘুম থেকে উঠে সৈকতে যাই, সূর্যোদয় দেখব বলে। যদিও কুয়াশার কারণে সূর্যোদয় সেভাবে দেখা সম্ভব হয় নি। বেশ কিছুক্ষণ থেকে হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে সবকিছু গুছিয়ে নিলাম, কারণ সেদিনই ফিরতে হবে ঢাকায়।
কোলাহলের শহর থেকে মাত্র দু’টো দিন দূরে থেকে যেন নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছি। নিজের স্বত্বাকে নতুন করে চেনার জন্য কুয়াকাটা অসম্ভব চমৎকার একটি জায়গা। পহেলা জানুয়ারি দুপুর ১১টায় সাকুরা পরিবহনের গাড়ি করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।
 
‘আমার প্রার্থনা এই,
পৃথিবীর সব ক্রোধ এক ঝড়ের রাতে
ফেলে দিই সমুদ্রের জলের গভীরে।
আমার প্রার্থনা এই,
আবার যেন যাই জলের কিনারায়
স্বর্গের সিঁড়িটা যেন চিনতে পারি।’ [ইচ্ছে-ব্ল্যাক]

 

  •  Kuakata Trip
  •  Bangladesh
  •  Kuakata, Patuakhali
  •  Bus
  •  Kuakata Parjatan Motel & Youth Zone
  •  Sea Food

0 comments

Leave a comment

Login To Comment