Image

সেন্ট মার্টিন ট্যুরের আদ্যপান্ত

আমরা বেশ ক’জন ক্লোজ বন্ধু মিলে দীর্ঘদিন থেকেই প্ল্যান করে আসছিলাম ভার্সিটির এডমিশন শেষ করে কোথাও একটা ঘুরতে যাবো, প্রায় ২/৩ মাস ধরে ডেট ঘোরাঘুরি চলছিল, শেষমেশ ২৪/১/১৯ ফিক্সড করলাম। ট্যুরের প্লেস হিসেবে সেন্টমার্টিন ই মাথায় ঘুরছিল, কজ চট্টগ্রামের সবই দেখা শেষ এতোদিনে, সেন্টমার্টিন ছাড়া। 

 

আমরা ছিলাম ৮ জন, সকলের মতামত নিয়ে ডেট আর প্লেস ফাইনাল করলাম। কখনো যাওয়া হয়নি বাট যারা গিয়েছে তাদের কাছ থেকে শুনে বাস,হোটেল,শিপ সব কিছু  প্রায় ২ সপ্তাহ আগেই বুকিং করা হয়। পুরোপুরি সিজন টাইম হওয়াতে বেশ দাম দিতে হয়েছে হোটেল ভাড়ায়, আমরা হোটেল অবকাশ(পশ্চিম দ্বীপ) ভাড়া করেছিলাম ২ রাতের জন্য ১০০০০ টাকায়, ধানমন্ডি বুকিং অফিস থেকে। রুম ভাড়ার সময় বলা হয়েছিল ১৪ জনের রুম, বাট বাস্তবে গিয়ে দেখি সর্বোচ্চ ৯ জনের বেশি থাকা কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমরা ৮ জন হওয়াতে আমাদের থাকায় কোন সমস্যা হয়নি।

 

২৪ জানুয়ারীর আগের ২ রাত ঘুমাতে পারিনি শুধু চোখেমুখে উঁকি দিচ্ছিল এডভেঞ্চার আর এডভেঞ্চার 😀। ২৪ তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার, সকালে বেশ কয়েকজনের ক্লাস ছিল ভার্সটিতে, আর ওরা সবাই ই আসবে মিরপুর থেকে তাই সম্পুর্ণ রেডি হয়েই চলে আসে । ক্লাস শেষ করে গুলিস্তান থেকে কিছু কেনাকাটা করে বিকেলের মধ্যে সবাই যাত্রাবাড়ি আমার বাসায় চলে আসে। কারণ বাস ছাড়বে সায়দাবাদ থেকে। 

 

সন্ধ্যায় সবাই বাসা থেকে বিদায় নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে মুসাফির হয়ে গেলাম। বাস ৯-৩০ টা থেকে একটু লেট করলো। ৯-৫০ এর দিকে বাস ছাড়লো। বাস চিটাগাং রোড যেতেই বড় এক জ্যামের দেখা মিললো, ভয়টা হলো পরের দিন ৯-৩০ এ শিপ টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের। শিপ মিস করলে যাওয়ার আর কোন উপায় নাই। প্রায় ৩০ মিনিট জ্যাম থাকার পর হানিফ গাড়ি ছুটে চললো চিরাচরিত স্বভাবে। 😃😃 স্পীড প্রায় ১২০-৩০ পর্যন্ত উঠাতে সক্ষম হলেন দক্ষ ড্রাইভার সাহেব। 

 

বাস কুমিল্লা নুরজাহান হোটেলে যাত্রাবিরতি দিল ২০ মিনিটের। আবার চললো, গাড়ি পথে দেখা মিললো চট্টগ্রামের অপরুপ রাতের সৌন্দর্য্য। একপর্যায়ে দেখি বাসে সব ঘুম আমি ছাড়া,  Abdullah Al Noman ও ঘুম চাদর মুরি দিয়ে। আমার চোখে ঘুম থাকলেও বাসের ওভারটেকিং দেখা থেকে ঘুমকে বেশি প্রাধান্য দিতে পারলাম না। দেখতে দেখতে কক্সবাজারে পৌছে গেলাম। একটা ডাকাত হোটেলে দ্বিতীয়বারের মতো যাত্রাবিরতি করলো। যেখানে খাবারের দাম পুরো গলাকাটা।😞😞।

 

কক্সবাজার শেষ করে টেকনাফে ঢুকে পরলাম ৬ টার মধ্যেই।১ ঘন্টার পথ ২ ঘন্টায় যেতে হয় কারণ টেকনাফের রাস্তা বেশ ভাঙা। টেকনাফের রাস্তায় চোখে পরার মত ছিল আরাকান থেকে আসা শরনার্থীদের করুণ চিত্র। কিছুদূর বাস গেলে পাহাড় আর কুয়াশার মাঝ দিয়ে সুর্য উঠার দৃশ্যটা চোখে লাগছিল বারবার😍😍

 

বাস টেকনাফ থামলো ৮ টার আগে আগে, সামনেই কেয়ারি সিনবাদের (শিপ) ঘাট। টেকনাফ নেমে বেশ কয়েকটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, মাত্র ৮ টা টয়লেট ঘাটে পুরুষ-মহিলাদের জন্য।  হাজার হাজার মানুষের জন্য এটা খুবই অল্প, কারণ একই টাইমে সবগুলো বাস এসে থামে এখানে। আর সকালের নাশতার কথা কি আর বলবো😥😥 খিদা নিয়ে অনেকেই দাম জিজ্ঞেস না করেই ঢুকে পরে একমাত্র হোটেলে, খাওয়া শেষে যখন শুনে পরোটা ১৫ টাকা আর ডালভাজি ৩০ টাকা😒। 

 

শিপে উঠার সিরিয়াল ধরলাম সারারাত জার্নি করে এখন আবার ৩ ঘন্টার মতো নাফ নদী আর  বঙোপোসাগর পারি দিতে হবে। জাহাজের ফরমালিটিজ সেড়ে দ্বিতীয় তলায় নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করলাম। সাঁতার না পারাতে এবং নৌভ্রমণে  বেশ ভীতু হিসেবে চোখ কপালে উঠার মতোই অবস্থা ছিল আমার। ডান বাম করে ৮ জন বসে পরলাম। নাফ নদীতে শিপ চললো প্রায় ১ ঘন্টার উপর, দেখার মতো ছিল দুপাশ দিয়ে পাখিদের অতিথিপরায়ণতা, সমুদ্রে প্রবেশ করলাম ঢেউ দেখা শুরু, পাশে মিয়ানমারের বর্ডার পাহাড় ঘেঁষে।  কিছুক্ষণ পর সাগরের মোহনায় চলে এলাম, জাহাজ দুলছিল এদিক ওদিক, আর আমার ভয়ও বাড়ছিল 😭😭।  ৩ ঘন্টা পর জাহাজ থেমে নেমে সেন্টমার্টিন ঘাটে নামলাম, ঘাট থেকে পায়ে হেঁটে ২০ মিনিট লাগলো পশ্চিম দ্বীপে অবস্থিত অবকাশ হোটেলে যেতে।।। 

 

হোটেলে চেক ইন করেই জোহরের নামায আদায় করলাম। পেটে ভারি খিদে নিয়ে লাঞ্চ করতে বসলাম। মাশা আল্লাহ  ৮ জন মিলে ১৫০০ এর মতো বিল করলাম😐😐 

 

কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে জার্নির ধকল নিয়েই পশ্চিম দ্বীপে ফুটবল খেললাম & সুর্য আর সাগরকে মুখ্য করে নিজেদের ফ্রেমবন্দী করলাম। হোটেলে এসে গোসল করলাম নোনা পানি থেকে মুক্ত হতে। 

 

সন্ধ্যায় দারুচিনি দ্বীপে বীচ ঘেসে হেটে চললাম, বীচের বিপরীতে কিছু দোকান মিলে ছোট্ট একটা মার্কেটের মতো গড়ে উঠেছে। আচার,বাদাম, শো পিচ, সামুক, ইত্যাদি এসব ছাড়াও সামুদ্রিক মাছ বারবিকিউ & ফ্রাই করে খাওয়ার সুব্যবস্হা আছে। দাম ৮০ থেকে ৩০০-৬০০ পর্যন্ত হয়ে থাকে।সেদিন কোন কিছুই কিনলাম না মাছও খেলাম না, কজ আমাদের প্ল্যান ছিল পরের দিন সব করবো। বেশ টাইম ঘুরলাম সমুদ্রের ঢেউ আসে আর সাথে করে নিয়ে আসে শো শো আওয়াজ। এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কখনোই আর্টিফিশিয়াল ভাবে পাওয়া যাবে না। খুব টায়ার্ড থাকায় রাতের খাবার সেরে শোয়ে পরলাম ১০ টার আগেই।

 

পরের দিন ফজরের আযানের সাথে সাথে উঠে গেলাম সুর্য উঠা দেখার জন্য। কোনমতে ফ্রেশ হয়েই পুর্ব দ্বীপে চলে গেলাম। কিছুটা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় আকাশে স্পষ্ট সুর্য দেখা যাচ্ছিলনা।  ৩০ মিনিট পর সুর্যের দেখা মিললো সঙ্গে সঙ্গেই সে দৃশ্য মেমোরিবল করে রাখলাম, সাথে আমরাও সাক্ষী হয়ে থাকলাম সাগরের ঢেউ, ঢেকি নৌকা, আর সুর্যের অপরুপ কম্বিনেশনের।

 

প্ল্যান মোতাবেক নাশতা সেরে ছেঁড়াদ্বীপ যাওয়ার কথা। ঝটপট নাশতা করে ঘাটের উদ্দেশ্যে বের হওয়া। এটা আবার আমার জন্য এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা, আগেই বলেছিলাম সমুদ্রভ্রমণ খুবই ভীতকর আমার জন্য। তার উপর ট্রলার দিয়ে ছেঁড়া দ্বীপে যেতে হবে😭😭

  • সাহস করে উঠে বসলাম লাইফ বোটে, বোট চললো ৩০ মিনিটের মতো। ছেড়াদ্বীপ নামলাম, ১-৩০ মিনিটের মতো ঘুরে দেখলাম মনে হলো এখানের ঢেউগুলো বেশ বড় বড় এবং পাথরগুলো খুবই পিচ্ছিল এবং ধারালো। আমি ছাড়া মোটামোটি ৮ জনের সবারই পায়ে কমবেশি ইনজুরি লেগেছে। ছেঁড়া দ্বীপ থেকে ফেরার পালা, ৮ জনের ৬ জন বোটে করে ফেরত গেলো কিন্তু আমি আর মালিক আসরার পায়ে হেঁটেই রাস্তা ধরলাম।৩০ মিনিটের বোটের পথ পায়ে হেঁটে আমরা দুজন ২ ঘন্টার উপর লাগালাম। পতিমধ্যে ছেঁড়া দ্বীপের একমাত্র পরিবারের (মৃত হোসাইন আলি পরিবার নামে খ্যাত) বাড়িতে রেষ্ট নিলাম, ডাব খেলাম। কথা বললাম  পরিবারের সদস্যদের সাথে।

হাটা ধরলাম,  এতো সুন্দর দৃশ্য আশেপাশে থাকাতে আমাদের দীর্ঘ হাটার রাস্তায় কোন ক্লান্তিই আসলো না।
ডানে বীচ ধরে  বায়ে নৌ ক্যাম্প, আনসার ক্যাম্প,  সেন্টমার্টিনের একমাত্র রিসোর্ট, আরো বেশ কিছু সুন্দর দৃশ্য ঘিরে আমাদের হাঁটা এক এডভেঞ্চারময় হয়ে উঠলো।

হোটেলে ফিরে সবাইকে বললাম, ওরা শুনে তৎক্ষনাৎ প্ল্যান করলো পরের দিন সাইকেলিং করে ছেঁড়া দ্বীপে যাবো সবাই।  দুপুর ঘনিয়ে এলো লাঞ্চও ডিমান্ড করছিল আমাদের উদর। দেরি না করে সরাসরি হাসান হোটেলে গিয়ে উদরপূর্তি করলাম ৮ জনে মাত্র ১৩৫০ টাকা বিল করলাম😥।

হোটেলে ফিরে কিছুটাইম রেস্ট নিয়ে বীচে গেলাম সুর্যাস্ত দেখার উদ্দেশ্যে, এ সময়টা খুবই স্পেশাল ছিল আমার জন্য,  কারণ সুর্যাস্ত টা আম্মুকে ভিডিও কলে রেখে একসাথে দেখেছিলাম।😍😍

মাগরিব দিগন্তে লাল আকাশ আর ঢেকি নৌকা ঘিরে ছবির সমাহার বানিয়ে ফেললাম। আধো আধো অন্ধকারে আমরাও ফ্রেমবন্দী করলাম নিজেদের।

পরের দিন চলে যাবো তাই যা কেনাকাটর আজকেই সারতে হবে। মার্কেটে গেলাম সবাই যার যার মতো কেনাকাটা করলো, তবে বাদাম, আচার, আর চকলেট কম্পলসরি হিসেবে সবাই ই নিল। প্রায় ৮-৯ টা বেজে গেলো, আনন্দের সময়গুলো মনে হয় খুব তাড়াতাড়িই চলে যায় আর্কাইভে রেখে।😭😭।

হোটেলে এসে সবকিছু রেখে প্ল্যান করলাম ফিশফ্রাই খাবো। আবার গেলাম সেইম প্লেসেই, মাছ বেছে বেছে ২ জন ২ জন করে ভাগ হয়ে জুটি করে অর্ডার করলাম। মাছের মধ্যে ছিল রুপচাঁদা, স্যালমন ফিশ, কুরাল।  ইত্যাদি। এতক্ষণে রাত ১১ টা পার হয়ে গেছে, হোটেল সব বন্ধ হয়ে গেছে, পরোটা কই পাবো এখন😨 আল্লাহর নাম নিয়ে আমাদের হোটেলের রেস্টুরেন্টে গেলাম রিকুয়েষ্ট করলাম,  অনেক কষ্টে ১৪ পিস মেনেজড হলো তা ও ঠান্ডা।😣😣। পরোটা আর ফিশ কম্বো করে মনে হয় জীবনের প্রথম খেলাম। সবার থেকে আমার আর Abdullah Al Noman এর মাছগুলো মজাদার ছিল।

আগামিকাল ঢাকায় চলে যাবো তাই রাতটা ঘুমিয়ে নষ্ট করতে চাইনি,রাত ১২ টায় বীচে রেস্ট খাটে শুয়ে সাগরের খেলা চোখের মধ্যে সেইভ করছিলাম😀😀
আরামদায়ক বাতাস আর জোয়ারের নোনা পানি কখন যে ঘুম পারিয়ে দিল টেরই পেলাম না। রাত ১ টা, জোয়ারের পানি দেখতে দেখতে রেস্টখাটের নিচে চলে এলো,  আর টায়ার্ডনেসের তীব্রতায় হোটেলে গিয়েই ঘুমিয়ে পরলাম।

সকালে ফজরের সাথে সাথে উঠেই সাইকেলিং করে ছেড়া দ্বীপে পথ ধরলো সবাই। প্রায় ৩-৪ ঘন্টা সাইকেলিং করে সবাই ই অনেক ক্লান্ত, একদম শরীর যায় যায় অবস্হা। 😞😞।  ১১ টা বেজে গেলো সকালের নাশতা করতে করতে। ২ টায় হোটেল চেক আউট,  তাই সময় নষ্ট না করে শেষবারের মতো গা ভাসালাম সমুদ্রের ঢেউয়ে। কেমন যেনো এক অদ্ভুত মায়া তৈরী হয়ে গেলো সমুদ্রের সাথে,  বারবার ফিরে আসতে চেয়েও বারবারই ঝাপ দেই সমুদ্রে।  প্রকৃতির এ ভালবাসা ত্যাগ করে আসা বড়ই কষ্টকর।

মাঝে নাশতা সেরে হুমায়ুন আহমেদের সমুদ্র বিলাস হোটেলও ঘুরেছিলাম।

হোটেলে এলাম ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে গেলাম।  চেক আউট করে জাহাজ ঘাটের পথ ধরলাম। ২-৩০ এ জাহাজে উঠলাম ,  জাহাজেের পথে নারায়নগঞ্জের মেয়র আইভিকে দেখলাম আমাদের সামনে দিয়ে খুবই সিম্পলি নরমাল সিটে গিয়ে বসলেন।

জাহাজ ছাড়লো ৩ টার একটু পর। সমুদ্রকে শেষবার দেখতে লাগলাম,  আর অজানা এক মায়ার বাধনে আবদ্ব করে ফেলেছে এটাও অনুভব করলাম। জাহাজ ছুটছে,  সমুদ্র পেরিয়ে নাফ নদীতে যেতেই সুর্যাস্তের সৌন্দর্য চোখ রাঙিয়ে তুললো। ৬ টায় ঘাটে নেমে বাসের পথে হাটলাম। আবারো প্রিয় হানিফ বাসই, ৭ টার দিকে বাস ছেড়ে,দিল।  এ ড্রাইভারকে কেন যেন একটু অদক্ষ মনে হলো। যাইহোক পুরোপথ ঘুমে ঘুমে চলে এলাম। তেমন কিছু মনে নেই আর। সকাল ৭ টায় বাসায় উঠলাম। উটার সাথে সাথেই প্রিয়বাণী, একদম কালো হয়ে এসেছে ভুতের মতো।😑😑😑

  •  সেন্ট মার্টিন ট্যুর
  •  Bangladesh
  •  সেন্ট মার্টিন
  •  Bus
  •  14000
  •  10000

0 comments

Leave a comment

Login To Comment