Image

স্বপ্নের বাঞ্জি

পোখরা থেকে ব্যাক করার দিন নাগারকোট যাওয়ার প্ল্যাণ করছিলাম বাসে বসে বসে। পুরো রাস্তা মন খারাপ ছিলো কারণ শুধু সাইট সিন করার জন্য এই সময় নেপাল আসার কোন ইচ্ছাই ছিলো না আমার। একটা মিটিং এর জন্য নেপাল আসলেও মিটিংটা হয়নি শেষ পর্যন্ত। ট্রিপের শেষের দিন আমার বাঞ্জি করার প্ল্যাণ অনেক আগের কিন্তু গত তিনদিনে আমাদের চার জনের প্রত্যেকের প্রায় ৩৫-৩৮ হাজার টাকা করে খরচ হয়ে গিয়েছিলো। নেপালের খরচ যে এত্ত বেশি যাওয়ার আগে আমরা কেউ ভুলেও আন্দাজ করতে পারি নি। বাঞ্জির জন্য দরকার আরো প্রায় ১২-১৩ হাজার রুপি। তাই বাঞ্জির শখটা এবারের মতোও বাদ দিয়ে প্ল্যাণ করছিলাম নাগারকোট সাইটসিনে যাবো।

বাস থেকে থামেল এসে নেসেছিলাম দুপুর ২ টার কিছু পরে। তারপর ড্রাইভার এসে পিক করে হোটেলে ড্রপ করে দিলো। ফ্রেশ হতে হতেই হোটেলের নিচে গাড়ী এসে হাজির। যাবো ভক্তপুর দরবার স্কয়ার, তারপর পশুপাতিনাথ মন্দির আর কই কই যেন। রাতে গোখরানা হাউজে ট্রেডিশনাল ডিনার উইথ কালচারাল শো। মানে আরো অনেক খরচ। বাঞ্জির যাও আশা ছিলো এটা শোনার পর তাও শেষ। এত দৌড়াদৌড়ির মধ্যে এজেন্ট সাইলেষ কে বলাই হয়নি যে আমাদের বাঞ্জির প্ল্যাণ বাদ দিয়ে দিসি।

ভক্তপুর দরবার স্কয়ার ঘুরে আর অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয়নি সেদিন। সন্ধ্যা হয়েগিয়েছিল আর আমাদের ডিনারে যাওয়ার কথা ছিলো সন্ধ্যা ৬:০০-৬:১৫ টায়। অতিরিক্ত ট্রাফিকের কারণে আমরা পৌছেছিলাম সাতটার একটু পরে। সাইলেষও আসলো। ততোক্ষণে কালচারাল শো প্রায় শেষ। যখন আমরা ঢুকলাম ততোক্ষণে কালচারাল শো প্রায় শেষ। খেতে খেতে সাইলেষকে বললাম বাঞ্জি দিতে ইচ্ছে করছে না তারচেয়ে বরং আমরা নাগারকোট যাবো। সে বললো “এটা এখন আর সম্ভব না।” সে অলরেডি আমাদের দুই জনের বাঞ্জি টাকা দিয়ে বুক করে ফেলেছে। আরো বলে দিলো আমরা যেন ভোরে উঠে আমাদের নাস্তা প্যাক করে নেই। ৫:৩০ এ ওদের গাড়ী আমাদের লাস্ট রিসোর্টে নিয়ে যাবে।

আমরা বাঞ্জি করেছিলাম নেপালের বিখ্যাত দ্যা লাস্ট রিসোর্টে। শহর থেকে বেশ দূরে একদম তিব্বতের বর্ডারের পাশে দারুন এক ইকো রিসোর্ট এই দ্যা লাস্ট রিসোর্ট। থামেলের মান্ডালা স্ট্রিটে দ্যা লাস্ট রিসোর্টের অফিস রয়েছে। যেকেউ এখান থেকেই বুক করতে পারবেন বাঞ্জি। বাঞ্জি ছাড়াও লাস্ট রিসোর্টে সুইং (বাঞ্জির চেয়ে ইন্টারেস্টিং), রাফটিং, ক্যাম্পিং এর ব্যবস্থা রয়েছে। বাঞ্জি অথবা সুইং জন্য আপনাকে গুনতে হবে পুরো ১০৮ ডলার কিন্তু বাঞ্জি আর সুইং দুটো একসাথে করতে পারবেন মাত্র ১৩২ ডলারে। এই প্যাকেজের মধ্যে থাকবে থামেল থেকে লাস্ট রিসোর্ট যাওয়া আসা, দুপুরের বুফে লাঞ্চ (তিব্বতিয়ান ডিস)। একবার দিয়ে মন না ভরলে এক্সট্রা ৫৫ ডলার পে করে আবার বাঞ্জি বা সুইং এর করতে পারবেন। থামেলের অফিস খোলা থাকে প্রতিদিন ৫:৪৫ থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত। বুকিং শেষে নির্ধারিত তারিখে  সকাল ৫:৪৫ মিনিটে থামেল অফিসে রিপোটিং করতে হয়। সবাই একসাথে হওয়ার পর ওদের ছোট মিনি বাসে করে নিয়ে যায় লাস্ট রিসোর্ট। বাঞ্জি ছাড়াও লাস্ট রিসোর্টে আপনি চাইলে Go & See ডে-ট্রিপ করতে পারবেন মাত্র ২২ ডলারে। তাতে ট্রান্সপোর্ট আর দুপুরের খাবার ইনক্লুডেট থাকবে। কেউ চাইলে ওভার নাইট স্টে প্যাকেজও নিতে পারবেন । শুধুমাত্র রিল্যাক্সের জন্য আপনাকে দিতে হবে ৬০ ডলার। রিল্যাক্স আর বাঞ্জি অথবা সুইং এর জন্য দিতে হবে ১২৮ ডলার।

আমরা ভোর ৫ টায় উঠে কোন মতে ফ্রেশ হয়ে দৌড়ে গিয়েছিলাম লাস্ট রিসোর্টের অফিসে। আমরা জানতাম ৫:১৫ রিপোর্টিং এর শেষ সময় কিন্তু আসলে সেটা ৫:৪৫। ৫:৩০ এর দিকে অফিস খুললো। মান্ডালা স্ট্রিটটা মোটামুটি খুব সুন্দর। একে একে সবাই আসতে লাগলো। বাংলাদেশ থেকে আমরা দুইজন করছি বাঞ্জি। সাথে ইউক্রেনের ৫০ উর্ধ্ব এক ভদ্রলোক যিনি কিনা ২০ বছর আগে বাঞ্জি করেছিলেন প্রথমবারের মতো। ইসরাইলের ৩ জন, ইন্ডিয়ান ৩ জন আর নেপালি ১ জন আর চাইনিজ একজন মেয়ে ছিলো। চাইনিজ মেয়েটা দেখতে যেমন সুন্দর ছিলো তেমন অসহায় ছিলো। বেচারী ইংলিশ বা হিন্দি কিছুই বোঝে আর আমরা পুরো বাসের লোক বা ক্রুরা তার কোন কথা বুঝি না। সে ইশারায় কথা বললেও আমরা শুধু হুম হা করে যাচ্ছিলাম কিছু না বুঝেই।

প্রায় ০৬ টা বাজে বাস ছাড়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বেড়িয়ে গিয়েছিলাম কাঠমুন্ডু শহর থেকে। নেপালের যত সৌন্দর্য্য তারসবই শহরের বাইরে। উচুনিচু আকাবাকা পাহাড়ী পথে জানালার বাইরের স্বর্গ দেখতে দেখতে প্রায় ০৪ ঘন্টা লেগেছিলাম লাস্ট রিসোর্টে পৌছাতে। বাস থেকে নামার পর সুন্দর একটা ঝুলন্ত ব্রীজ। ব্রীজের ওপারেই লাস্ট রিসোর্ট। বাঞ্জি সুইং যা হয় তার সবই এই ব্রীজ থেকেই হয়। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো একটা পরিবেশ লাস্ট রিসোর্টে। প্রথমেই ওয়েলকাম ড্রিংক হিসেবে সামনে জুস দেয়া হলো। তারপর আবার লিস্ট চেক করে এক এক করে সবার ওজন মেপে গ্রুপটাকে দুইভাগে ভাগ করে বেসিক ইন্সট্রাকশন দেয়া শুরু করলো একজন বাঞ্জি মাস্টার। ৪৫-৬০ কেজি পর্যন্ত একগ্রুপ আর ৬১-১০০ কেজি পর্যন্ত আরেকগ্রুপ। যখন ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলো তখন কেন যেন বুকটা ধরফর করে উঠলো। আমি নিশ্চিত আমি ছাড়া তখন কারোই অতোটা নার্ভাস লাগে নাই। বাঞ্জিতে একটা কথা খুব প্রচলিত। সেটা হচ্ছে “নো সেকেন্ডে চান্স”। আপনি যদি কোন কারনে প্রথমবার জাম্প দিতে অস্বীকার করেন তাহলে আপনি আবার দ্বিতীয় বার জাম্প দেয়ার সুযোগ অথবা টাকা কোনটাই পাবেন না।

আমার ওজন ৬৭ কেজি হওয়াতে আমি প্রথম গ্রুপে পড়লাম। মূল্যবান যেকোন সামগ্রী যেমন, মোবাইল, ক্যামেরা, ঘড়ি সবকিছু একটা লাকারে রেখে প্রিপারেশন নিচ্ছি। লাস্ট রিসোর্টে ১০০ নেপালি রুপি দিয়ে লকার নেয়া যায়। ব্যবহার শেষে চাবি ফেরত দিলে এই টাকা রিফান্ডেবল। আমি ভিডিওর জন্য বুকিং দিয়ে যতোক্ষণে বাঞ্জি স্টেশনে গেছি ততোক্ষণে আমাদের টিমের প্রথম জন বাঞ্জি দেয়ার জন্য রেডি। উনিই ইউক্রেনের বাসিন্দা। এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেক করতে নেপাল এসেছিলেন। উনি যখন হার্নেস পড়ছিলেন তখন আমি মাত্র ওখানে গিয়েছিলাম। ওয়েট লিখে রাখার সীটে সাইন করতে গিয়ে ভুলে সেকেন্ড জাম্পের লিস্টে সাইন করে ফেললাম। কয়েকজনেরটা দেখে পড়ে জাম্প করবো ভেবেছিলাম প্রথমে। পরে ভাবলাম যা হওয়ার হবে। মাস্টাররা যখন হার্নেস ক্যারাবিনা পড়াচ্ছিলেন তখন আস্তে আস্তে আমার ভয় কাটতে শুরু করেছিলো। গত কয়েক বছরে প্রচুর ভিডিও দেখেছি বাঞ্জির। আমি জানি কিভাবে লাফ দিতে হয়। এই বাঞ্জি দেয়ার শখ আমার অনেক বছর আগে থেকেই ছিলো। অবশেষে সেই দিনের সেই শেষ মূহূর্তের কথা আসলে বলে বা লিখে বোঝানো সম্ভব না কোন ভাবেই। মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম অনেক কিছু বলবো কিন্তু ভিডিও ক্রু যখন ক্যামেরা সামনে নিয়ে আসলো মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছিলো না উত্তেজনার কারণে।

অবশেষে চলে আসলো জীবনের সেই বহুল প্রতিক্ষিত মূহূর্ত। পেঙ্গুইনের মতো এগিয়ে যাচ্ছি। এগুতে এগুতে এমন জায়গায় গিয়ে দাড়ালাম যেখান থেকে পেছনে আসা সম্ভব না। তারমানে আমি রেডি। পেছন থেকে একটা লম্বা নিশ্বাস নিতে বলে কাউন্ট ডাউন শুরু হলো। ওয়ান… টু…. থ্রি…. ব্যস! একটা চিৎকার দিয়ে আমি শূন্যে ঝাপিয়ে পড়লাম নিচের বিশাল বিশাল পাথরের দিকে পড়তে লাগলাম ১৫০ কিলোমিটার স্পিডে। ধীরে ধীরে পাথর গুলো স্পষ্ট আর আকারে বিশাল হতে লাগলো। বুঝতে পারছিলাম বেশ কয়েকটা বিট মিস করে গেছি। প্রথমে কিছু মনে না হলেও ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যেই মনে হলো “এটা কি হইলো। যদি ছিড়ে যায় দড়িটা”। বুঝতে বুঝতেই পেছনে টান লাগলো। আবার উঠে গেলাম প্রায় কয়েকশ ফুটের মতো উপরে। প্রায় সেকেন্ড তিনেকের মতো ফ্রি ফলের পর কয়েকশ ফিটের বাউন্সিং তেমন কিছুই মনে হচ্ছিলো না। স্বপ্ন পূরনের আনন্দ যে কি জিনিস ওই মূহূর্তে আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। সেই ছোটবেলা এইচএসসিতে এ প্লাস পেয়ে ভাবছিলাম স্বপ্ন পূরণ হয়েছিলো। ভালো লেগেছিলো খুব। কিন্তু এই ভালো লাগার কাছে ওই ভালো লাগা নিতান্তই তুচ্ছ। আমি চিল্লাপাল্লা সবসময়ই বেশি করি। ইচ্ছা ছিলো বাঞ্জি দেয়ার সময় আকাশ বাতাস কাপিয়ে দিবো চিৎকার দিয়ে। দিলামও তাই। প্রায় ৫০০ ফিট নিচ থেকে সবাই শুনতে পাচ্ছিলো আমরা আনন্দের চিৎকার। দ্বিতীয় বাউন্সের পর পায়ের লক খুলে পেন্ডুলামের মতো ঘুরলাম বেশ কিছুক্ষণ। প্রতিটা সেকেন্ড মিনিট তখন খুবই মূল্যবান আর এডভেঞ্চার ছিলো। যখন ঘোরাঘুরি বন্ধ হলো তখন উপর থেকে লক পাঠালো। নিজেকে লাগিয়ে নিলাম সেই ক্যারাবিনার সাথে। শেষ হলো আমার স্বপ্ন পূরণের খেলা।

বাঞ্জি শেষে ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুরো লাস্ট রিসোর্ট। খুব সুন্দরভাবে সাজানো এই রিসোর্টটা। রাতে থাকলে দারুন ভালো লাগতো চিন্তা করলাম বরাবর। হল রুম, রেস্টুরেন্ট-বার, ডাইনিং, ওপেন স্পেস, পুল, সুনা, ক্যাম্পিং টেন্ট দারুনভাবে পরিপাটি করে সাজানো। অবসর সময় কাটানোর জন্য এটি দারুন অপশন হতে পারে সবার কাছে। নেপাল যারা হেরিটেজ ট্যুর দিতে যান তারা অবশ্যই একবার ঘুরে আসতে পারেন এই রিসোর্ট থেকে।

একে একে সবার বাঞ্জি দেয়া শেষ হলে হল রুমে সবার জাম্পের ভিডিও দেখানো হচ্ছিলো। যারা ভিডিও নিতে আগ্রহী তারা ২৩০০ রুপিতে দিয়ে বুক করলে ওরা তিনদিন পরে এই ভিডিও “উই লিংক” এ আপলোড দিয়ে লিংক দিয়ে দিবে। ভিডিওর জন্য বুকিং দিলে মিলবে লাস্ট রিসোর্টে লগো প্রিন্ট সম্বলিত একটি টিশার্ট। আমরা আগেই বুক করে টিশার্ট গায়ে দিয়েই জাম্প করেছিলাম। ভিডিও চলার সময় হয়ে শুরু হলো হালকা বৃষ্টি। আর শেষ হতে হতে ডাইনিং এ খাবার চলে এসেছিল। খেয়ে দেয়ে বেশি কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে একগাদা ছবি আর স্মৃতি নিয়ে আমরা রওনা হয়ে গিয়েছিলাম কাঠমুন্ডুর পথে।

বিঃদ্রঃ দেশে বা দেশের বাইরে যেখানেই যান না কেন, অপচনশীল কোন দ্রব্য বা নোংরা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না।

  •  Nepal Daa-2019
  •  Nepal
  •  The Last Resort
  •  Car (Hire)
  •  Hotel
  •  Buffet

0 comments

Leave a comment

Login To Comment