Image

কংলাক পাড়ায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত!

সাজেক ভ্যালিতে এবার নিয়ে ৪র্থ বার যাওয়া হচ্ছে । ৭ জনের বন্ধুদের দল যাচ্ছি এবার , সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হলো সবে । সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় ‘সোশিওলজি অফ মাইনোরিটি’ নামের একটি কোর্সে পরীক্ষা দিতে হয়েছে এবার । এই কোর্সে মূলত ‘বাঙালী স্যাটেলার’ আর এই পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের দুঃখ কষ্টের দিন নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে । 

তো যেমন ভাবা তেমন কাজ , পরীক্ষা শেষ হতেই সিদ্ধান্ত এইবারে সাজেকের অপার সৌন্দর্য্যের মেঘ দেখতে নয় বরং মানুষের সাথে মিশতে যাবো , তাঁদের সাথে কথা বলবো , তাঁদের কষ্টের ভাগীদার হবো । ঢাকা থেকে সাজেকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে প্রথমেই খাগড়াছড়ির বাসে করে , খাগড়াছড়িতে পৌছালাম তারপর ‘চান্দের গাড়িতে’ করে বাঘাইছড়ি থানা পর্যন্ত গিয়ে আর্মির এসকোর্টের জন্য অপেক্ষা । ১০টায় আর্মির এসকোর্টে সাজেক ভ্যালির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু । এই রাস্তায় সবচেয়ে আশ্চর্য করবে আপনাকে , পাহাড়ের মাঝে মাঝে ছোট্ট ছোট্ট একটা দুইটা ঘর , আশে পাশে আর কিচ্ছু নেই । মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে মানুষ আবার এখানে থাকে কিভাবে?

সাজেকে পৌছানোর পর , ঐদিন দুপুরের খাবার খেয়ে একটু হেলিপ্যাডের দিকে ঘুরে আসাও হলো আর সূর্যাস্ত দেখে নেয়া হলো । ও হ্যা , দুপুরের খাবারের জন্য আগে থেকেই বলে রাখতে হবে – কটেজকে । তাঁরা সেই অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করবে । রাতের বেলা সাজেকে খুব কম সময়েই বিদ্যুত পাওয়া যায় । ভ্রমনে গেলে ঘুমানো এক ধরণের পাপ ই বলা চলে! কিন্তু তারপরও দেখা যাবে বন্ধু বান্ধবের দুই একজন পুরোদমে ঘুমাচ্ছে । তো যাই হোক , কটেজের পাশে এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক মেয়ের দোকান আছে , চা – কফির । সে কি , চমৎকার হাত । যতবার যাই সাজেকে , প্রত্যেকবার মুগ্ধ হই তার হাতের চায়ের । চা খেয়ে একটু হাটাহাটি করতেই , একটু দূর থেকে গানের শব্দ শোনা যাচ্ছে । কিন্তু গানের মানে খুঁজে পাচ্ছি না । আরেকটু কাছে গিয়ে বুঝলাম , উপজাতিদের গান । যোগ দিলাম তাঁদের সাথে , যে গান গাচ্ছে তার নাম মিঠুন , মিঠুন চাকমা – বয়সে চল্লিশ – পয়তাল্লিশ হবে । বোঝার কোন বালাই নেই , কি চমৎকার আতিথেয়তা । কথায় কথায় জানতে পারলাম , তাঁরা আগে এখানেই থাকতো – এখন ভারতের মিজোরামে থাকে কারণ বাঙালী স্যাটেলারদের একপেশে আচরণে প্রচন্ড বিরক্ত তাঁরা । কোর্সের সাথে কিছু মিল খুঁজে পেলাম । রাত ১টায় ফিরে এলাম , কটেজের দিকে । আকাশের দিকে তাকাতেই দেখি লক্ষ লক্ষ তারা । কি সুন্দর , কি অপূর্ব , কি অমায়িক । এর মধ্যেই বন্ধুদের মধ্যে একজন গান ধরলো – ‘ আমার ভিনদেশী তারা , একা রাতের ই আকাশে … ’ 

গান চলতে চলতে , কটেজের বারান্দায় কখন যে ঘুমিয়ে গেছি তার ঠিক নেই । এর মধ্যে এক বন্ধু ভাগ্যিস এলার্ম দিয়ে রাখাতে , ভোর ৪.৪০ এ সবার ঘুম ভাংলো । ঘুম ঘুম চোখে আমাদের মূল যাত্রা শুরু! কটেজ থেকে হাটা শুরু করলাম কংলাকের উদ্দেশ্যে , সকাল সকাল হাটতে খুব একটা খারাপ লাগে না যদিও ।

পাহাড়ের রাস্তা ধরে উঠে গেলাম কংলাকের চূড়ায় । উঠতে উঠতেই খেয়াল করলাম অনেকে উপর থেকে নীচে নামছে , বিভিন্ন কাজের আশায়  । কংলাকের চূড়ায় বেশ কয়েকটি পরিবারের বসবাস । একটি স্কুল ও আছে । ছোট দুই একটি মুদি দোকান আর চায়ের দোকান ও দেখা যায় ।

ছোট্ট একটা বাচ্চার সাথে কথা বললাম , ঠিকমত অনেক কথা না বুঝলেও এইটুকু বুঝলাম ওখানে তাঁরা থাকতে চায় না । স্কুলে ক্লাস হয়না ঠিকঠাক , খাবারের কষ্ট সবচেয়ে বেশি কষ্ট পানির । আরো দুইজন মুরুব্বী টাইপের স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বললাম , তাঁদের ও মিঠুন দাদার মত একই কথা । স্যাটেলাররা সব দখল করতে চায় , তাঁরাও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ – এই মাটি ছাড়বে না ।

কথা বলতে বলতে , সূর্য প্রায় চোখে মুখে আচড়ে পড়লো । কি অমায়িক , ভয়ংকর রকমের সুন্দর এই কংলাক । অথচ এখানকার মানুষগুলো চোখে মুখে ঠিক ততটাই অন্ধকার । সারাদিন তাঁদের সাথে সেখানেই থেকে সূর্যাস্তের অপেক্ষায় অন্ধকার আসার সাথে সাথে কংলাক পাড়াও অন্ধকার আচ্ছন্ন হয়ে গেলো ।

 

সত্যি কথা বলতে , আমরা যতটা আগ্রহ নিয়ে এই ভ্রমণগুলো করে থাকি এতে তাঁরা যে খুব একটা বিরক্ত সেটাও না । তার শুধু একটু শান্তি চায় , কারো অন্যায় হস্তক্ষেপ চায় না । ভালো থাকুক , কংলাকের মানুষেরা , ভালো থাকুক কংলাক পাড়া ।

 

  •  তাঁদের সাথে একদিন ...
  •  Bangladesh
  •  কংলাক পাড়া , সাজেক ভ্যালী , খাগড়াছড়ি
  •  পথে
     পথে
  •  Bus
  •  মেঘপুঞ্জি রিসোর্ট
  •  সাজেক ভ্যালি

0 comments

Leave a comment

Login To Comment