Image

মন ভোলানো মনপুরা দ্বীপে

বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অপরূপ সৌন্দর্যের  মায়াভূমি মনপুরা দ্বীপ । মেঘনা নদীর বুকে সবুজ বনভূমি বেষ্টিত মনপুরা দ্বীপ। দ্বীপের একপাশে উপকূলীয় বনাঞ্চলে রয়েছে মায়াবী চিত্রা হরিণ আর শীতে আসে হাজারো অতিথি পাখি।

 

গত কিছুদিন আগেই ঘুরে এলাম মনপুরা দ্বীপ থেকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় দ্বীপগুলোতে সুপেয়  পানি নিয়ে গবেষণা কাজ করতেই গিয়েছিলাম মনপুরা দ্বীপে। আকশে মেঘ আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর কালবৈশাখীর ভয় মাথায় নিয়ে ঢাকা থেকে মনপুরাগামী লঞ্চে আমরা যাত্রা শুরু হল। মুন্সিগঞ্জ পেরিয়ে মেঘনায় চলে এল আমাদের লঞ্চবৃষ্টি থেমে গিয়ে মিষ্টি হাওয়া বইতে শুরু করল। রাত বাড়তেই আকাশ ও পরিষ্কার হয়ে গেল। আমাদের লঞ্চ মনপুরা পৌছতে সকাল হয়ে যাবে । রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোরের প্রথম আলো জানালার ফাক দিয়ে মুখে এসে পড়লবাইরে এসে দেখি সূর্যোদয়ের প্রথম স্নিগ্ধ আলোয় চারিদিকে এক অদ্ভুত মায়াবী আবেশ। দু একটা জেলে নৌকা মাছ ধরছেসোনালী আলোয় ঝিকমিক করছে নদী। আমরা মেঘনার কোন এক শাখা দিয়ে আমাদের লঞ্চ এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি ছোট ঘাট পেরিয়ে মনপুরা ঘাঁটে আমাদের লঞ্চ ভিড়ল। ঘাঁটটি ছোট হলেও মানুষ অনেক এখানে। আমরা একটা অটোতে করে পৌছলাম হাজিরহাট বাজারে।  

সরকারি ডাকবাংলো সহ বেশ কিছু সাধারন মানের হোটেল রয়েছে। আমরা হোটেল থেকে বের হয়ে হাজিরহাট বাজারে নাস্তা শেষে একটা অটোরিক্সা নিয়ে মনপুরা ঘুরতে বের হলাম। মনপুরা ভোলা জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। মনপুরা উপজেলায় চারটি ইউনিয়নপ্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। অধিকাংশ অধিবাসী মৎস্যজীবিআবার অনেকেই কৃষি কাজের সাথে জড়িত। মনপুরায় একটিই পাকা রাস্তাযা কখনো বাঁধের ধারে,কখনো বাজারে,বা কখনো গ্রামের মাঝ দিয়ে পুরো মনপুরায় বিস্তৃত । আমরা দক্ষিনের উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়ন হয়ে একেবারে দক্ষিনে অবস্থিত দক্ষিন সাকুচিয়া পর্যন্ত গেলাম। একপাশে সবুজ উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন আর অন্যপাশে মাঠে মুগ ডালের বিস্তির্ন সবুজ ক্ষেত। এসব মাঠে বর্ষায় কেবল একবার ধান জন্মায় কিন্তু এখন অনেক চাষী অন্য মৌসুমে ও মুগ ডাল ও বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেকারন অল্প পানিতেই এসব চাষ সম্ভব।

দ্বীপের একেবারে দক্ষিনে অনেকটা সৈকতের মত ছোট একটা জায়গা।  দূরের ছোট ছোট সবুজ দ্বীপ দেখা যায় এখান থেকে। ফেরার পথে এক জায়গায় আমরা একদল চিত্রা হরিণের দল দেখতে পেলা্ম। রাস্তা দিয়ে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাচ্ছিল। এত কাছে থেকে এই প্রথম হরিণ দেখা, এত সুন্দর লাগছিল হরিণ গুলোকে। ঝটপট কিছু ছবি তুলে ফেললাম। লোকালয়ের এত কাছে হরিণের দেখা পাওয়ায় মনে খটকা লাগলোআমাদের গাড়িচালককে জিজ্ঞেস করতেই বলল, প্রতিনিয়ত অবাধ গাছ কাটা আর নতুন বসতি স্থাপনের ফলে ম্যানগ্রোভ বন ছোট হতে হতে এমন দাড়িয়েছে যে, লোকলয় চলে এসেছে বনের খুব কাছে। আগে আরো প্রচুর হরিণ ছিল, প্রশাসনের নিষেদ্ধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই এখানে হরিণ শিকার হয়। এত সুন্দর প্রাণীগুলো হারিয়ে যাবে এই দ্বীপ থেকে, ভাবতেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। অথচ এই প্রাকৃতিক পরিবেশে হরিণের বিচরন দেখার জন্য এই দ্বীপটা হতে পারত প্রকৃতিপ্রেমীদের এক নতুন গন্তব্য।

 

দুপুরের খাবার শেষে গেলাম সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে গড়ে উঠা মনপুরা ফিশারিজে। প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ খামারবাড়িটি চমৎকার ভাবে সাজানো, দারুন সম্ভবনা রয়েছে এটিকে কেন্দ্র করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠার। খামারবাড়িতে সারি সারি নারিকেল গাছ ও বিশাল টি পুকুর রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন খামারবাড়িটি হতে পারত ভ্রমনপীয়াসীদের বাড়তি আকর্ষণ। খামারবাড়িটির পূর্ব পাশেই বিশাল ম্যানগ্রোভ বন। আমরা ফিরে এলাম হাজিরহাটে। হাজিরহাট ঘাট থেকে সূর্যাস্ত দেখব। আসতে আসতে আমাদের অটোরিক্সার মামা জানালেন, একসময় এ দ্বীপে পর্তুগীজদের আস্তানা ছিল। তারই নিদর্শন হিসেবে নাকি দেখতে পাওয়া যায় কেশওয়ালা কুকুরযদিও আমাদের চোখে পড়েনি। মনপুরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সারি সারি বাগান। মনপুরায় ছোটবড় ৮১০টি চর ও বন বিভাগের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সবুজ বিপ্লব। শীত মৌসুমে শত শত পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে এসব চরাঞ্চল। এই চরগুলো হলো চরতাজাম্মুলচর পাতালিয়াচর পিয়ালচরনিজামচর সামসুউদ্দিনলালচরডাল চরকলাতলীর চর ইত্যাদি।

লম্বা জেটির মত ঘাটে মাতাল করা বাতাসএক সময় আকাশ লাল করে ডুবে গেল সূর্য । বাজারে এসে এখানকার বিখ্যাত মহিষের দই খেলাম। সাধারনত মহিষের টক দই টা বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু এখন মিষ্টি দই ও পাওয়া যায়। আমাদের পরের দিনটি গেল গবেষনার কাজে। লঞ্চে করে ঢাকায় ফেরার সময় বার বার এই মন ভোলানো মনপুরার কথা মনে পড়ছিল। না জানি বর্ষায় কেমন লাগবে এই মায়াবী দ্বীপকে কিংবা শীতে।

মনপুরাতে ভাল মানের পর্যটন হোটেল নাই, তাই যারা প্রকৃতিকে তার নিজস্বরূপে দেখতে চান, তাদের জন্য মনপুরা এক আদর্শ জায়গা। তবে মনপুরায় যদি ভাল মানের হোটেল গড়ে উঠে,পর্যটকদের আগমন বাড়বে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করলে মনপুরাও হতে পারবে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র

  •  মন ভোলানো মনপুরা দ্বীপে
  •  Bangladesh
  •  Monpura, Bhola
  •  Boat/Launch
  •  স্থানীয় হোটেল, সরকারী ডাক বাংলো
  •  হাজিরহাট বাজারে সব ধরনের খাবার পাওয়া যায়

0 comments

Leave a comment

Login To Comment