Image

বন্ধু

আমার ভার্সিটি লাইফে হওয়া প্রথম ফ্রেন্ড সাকিবের জানাজায় এসেছি।ওর লাশটা সাদা কাফনে মুড়িয়ে খাটিয়াতে রাখা আছে।মায়াভরা ওর মুখটা দেখে মনে হচ্ছে ও নিঃচিন্তে দুই চোখ বুজে ঘুমিয়ে আছে যে হয়ত একটু পরেই জেগে উঠবে।কিছুটা দূরে ওর বাবা কাঁদছেন অন্য একজনকে জড়িয়ে ধরে।বাড়ির ভেতর থেকে মায়ের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে।তেইশ চব্বিশ বছরের একজন সন্তানের লাশ তার পিতার কাঁধে যে কতটা ভারি সেটা শুধুমাত্র সেই পিতাই উপলব্ধি করতে পারেন।
.
সাকিবের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ভার্সিটিতে ভর্তির দিনেই।ওইদিন হাতে লাল রংয়ের একটা ফাইল নিয়ে সাদা শার্ট পরা একটা ছেলে এসে আমাকে সিনিয়র  ভাই ভেবে জিজ্ঞেস করেছিল,”ভাইয়া ভর্তি হতে কি সত্যায়িত ছবি লাগবে?”..আমি খানিকটা ভাব নিয়ে বলেছিলাম,”হুমম লাগবে”।পরে যখন ও জানল আমি ওর সাথেই একই ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হব তখন বেশ লজ্জা পেয়ে গেছিল সাকিব।ওর সেই লাজুক মুখটা এখনও আমার চোখে ভাসে..কে জানত সাকিবের সেই মায়াভরা মুখটা আজ এভাবে কাফনে ঢাকা দেখতে হবে!.
.
সাকিবের যেই গুনটা আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করত সেটা হচ্ছে ওর সহজসরলতা।ও খুব সহজে মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলত।মানুষের সাথে চট করে মিশে যেতে পরত।ওর এই গুনগুলো আমি জানতে পেরেছিলাম ওকে মেসে রুমমেট হিসেবে পাবার পর।এত গুনের মধ্যে ওর একটা ব্যাড হ্যাবিট ছিল।সেটা হচ্ছে ও মাঝে মাঝে সিগারেট খেত।রুমের মধ্যে আমার জন্য সিগারেট খেতে পারত না।কারণ আমার সিগারেটের গন্ধ সহ্য হোত না।বাইরে যেয়ে মাঝে মাঝে দুই একটা খেত।তবে ওর আরেকটা খারাপ অভ্যাস ছিল ও প্রচুর রাত জাগত।শুধুমাত্র মুভি দেখেই সারারাত অনায়াসে কাটিয়ে দিত।ভার্সিটি শুরুর দিনগুলোতে ক্লাসের পর সমস্ত ক্যাম্পাস দাপাদাপি করে বেড়ানোর আমার একমাত্র সাথি ছিল সাকিব।দুই বন্ধু মিলে কত বিকাল যে ক্রিকেট খেলে কাটিয়ে দিয়েছি তার হিসাব নেই।
.
সাকিব খুব ভালো গিটার বাজাতে পারত।আর এজন্যই ক্যাম্পাসে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে অনেকের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে যায়।আর এই জিনিসটাই ওর জন্য কাল হয়ে দাড়ালো।ক্যাম্পাসের অনেক সিনিয়ার ভাইয়ের সাথে ওর উঠাবসা হোত।ফাস্ট ইয়ারের শেষের দিকে ও একদিন অনেক রাতে রুমে আসে এবং পকেট থেকে কাগজে জড়ানো লাল লাল কিছু একটা ট্যাবলেটের মত বের করে আমাকে দেখায়।এবং বলে
.
-“দোস্ত জানিস এইটা না চরম একটা ওষুধ।আমি গতরাতে জাবেদ ভাইয়ের সাথে খাইছি এটা।এটা খেলে সারারাত ঘুম ধরে না।চরম ফিলিংস পাওয়া যায় এটা খেলে।তবে এটা খাওয়ার প্রসেসটা একটু আলাদা।এটা সিগারেটের সাথে খাওয়া লাগে।আমি খাই তুই দেখ..” এটা বলেই সাকিব মোমবাতি টাইপের কিছু একটা পকেট থেকে বের করে ধরালো।আমার আর বুঝতে বাকি রইল না সাকিব মরণ নেশায় পা দিচ্ছে।আমি সাথে সাথে ওর হাত থেকে সব কিছু কেড়ে নিলাম।ওকে বুঝালাম এটা তোর করা উচিত না।তুই এখানে পড়াশোনা করতে আসছিস।এগুলা করার জন্য না।এমনকি আমি ওই রাত জেগে ওকে পাহারা দিয়েছিলাম যেন ও উল্টাপাল্টা কিছু না করতে পারে..
.
পরেরদিন আমি টিউশানি করে এসে রুমে ঢুকতেই দেখি  রুম থেকে দুইটা সিনিয়ার বের হয়ে যাচ্ছে।আর সাকিব রুমে চুপচাপ বসে আছে।তার পুরো চোখ লাল।মেঝেতে মোমবাতি আর সিগারেটের টুকরা পড়ে আছে।আমার বুঝতে বাকি রইল না যে এখানে কি হচ্ছিল এতক্ষণ।আমি ওকে বেশি কিছু বললাম না।কারণ জানি এখন বললে কোন লাভই হবে না।শুধু বলেছিলাম,”নিজের লাইফটা নষ্ট করিস না দোস্ত।” ও মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিল “মায় লাইফ মায় রুলস”..
.
এরপর থেকে সাকিবকে রুমের মধ্যে কম বাইরে বেশি দেখা যেত।সারারাত বাইরে থাকত।শুধু সকাল বেলা রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ত।দিনের পর দিন ক্লাসগুলা মিস দিতে থাকে।ভার্সিটি থেকে ওর বাসায় কল দেওয়া হয়।ওর আম্মু আমাকে ফোন দিয়ে ওর কথা জিজ্ঞেস করেন।আমি সবকিছু খুলে বলি আন্টিকে।আংকেল অনেক রাগি মানুষ ছিলেন।তিনি পরের দিনই ক্যাম্পাসে আসেন এবং সাকিবকে অনেক বকাঝকা করেন।যার পুরো দায়ভার সাকিব আমাকে দেয়।এমনকি সাকিবের গার্লফ্রেন্ড নিতু সাকিবের সবকিছু জানার পর ওর সাথে ব্রেকআপ করে।আর সাকিব ভাবে তার এই ব্রেকআপের পেছনেও আমার হাত আছে।যেটা ছিল সাকিবের পুরোপুরি ভুল ধারণা।এরপরের কিছুদিন সাকিব আমাকে সহ্য করতে পারত না।আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয় এবং সবশেষে আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ নষ্ট করে মেস চেঞ্জ করে হলে উঠে যায়।
.
রুম চেঞ্জ করার পর থেকে সাকিবের সাথে আমার দেখা খুবই কম হোত।ও ক্লাসে আসতো না আবার পরিক্ষায় এটেন্ড করত না।আমি তবুও ওর রুমে যেতাম।ওর রুমে যেয়ে প্রতিদিনই ওকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতাম।ওর স্বাস্থ্য একেবারে শুকায় যাচ্ছিল।ওকে কিছু বললে ও চুপচাপ নিচের দিকে তাকায় থাকত।কোন কথার উত্তর দিত না।যে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাস করলে ‘হা’ করে মুখের দিকে তাকাতো।ওকে দেখে ঠিক যেন একজন মানসিক রোগির মত মনে হোত।খুব কাছের একজন বন্ধুকে আস্তে আস্তে ধ্বংস হতে দেখা যে কতটা কষ্টকর সেটা ঐ জায়গায় না দাড়ালে কেও বুঝবে না।
.
ফাইনাল পরিক্ষা চলাকালীন একদিন শুনলাম সাকিব নাকি মাথা ঘুরে হলের সিড়িতে পড়ে গেছে।ওকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তার ওর অবস্থা বেগতিক দেখে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলে।ঢাকায় নেওয়ার পর বিভিন্ন টেস্ট করে সাকিবের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং পরে সাকিবকে উন্নত চিকিতসার জন্য আন্টি আংকেল ইন্ডিয়া নিয়ে যান।কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।সাকিবকে শেষমেস লাশ হিসেবেই দেশে ফেরত আনা হয়..
.
দূর থেকে আযানের শব্দ শোনা যাচ্ছে।ফরজ নামাজের শেষে সাকিবের জানাজা শুরু হলো।ইমাম সাহেব সবাইকে সারি করে দাড়াতে বললেন।চারপাশে প্রচুর লোক জমায়েত হয়েছে।সবাই শুধু লাশটা একনজর দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।জানাজার পরেই ওকে দাফন করা হবে।ওর লাশ দাফনের সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে ওকে নিয়ে ওর বাবা মার চোখে থাকা স্বপ্নগুলো।কিন্তু ওর মায়ের আহাজানি শেষ হবে না।সন্তান হারানোর সেই বেদনা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এভাবেই তাকে কুরে কুরে খাবে…
.
Writer: Ideal faruk.

  •  বন্ধু
  •  Bangladesh
  •  Comilla Bangladesh
  •  Others
  •  Comilla Bangladesh
  •  Mango
  •  .

0 comments

Leave a comment

Login To Comment