Image

কুমিড়া থেকে কক্সবাজার— শুধুই মুগ্ধতা

প্রথমে আমরা ছিলাম তিনজন। কিভাবে আমাদের যাত্রা হয় তার শুরুর দিকটা বলি। আমি, আরিফ এবং রাকিব ভাই ক্লাস পরীক্ষা আর নানাবিধ তরুণাক্রান্ত হতাশায় ভুগে অপমানজনক রেজাল্টকার্ড আর জ্যাম ঠুকরে সব মিলিয়ে মাত্র পনেরো'শ টাকা নিয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে জাহাঙ্গীরনগর থেকে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতো লোকাল বাসে ঝুলতে ঝুলতে রওনা হলাম এয়ারপোর্ট রেলস্টেশন। সেখানে আমাদের সাথে যুক্ত হলো আমাদের আরো পরিচিত ক'জন ভাই ও আপু। যেহেতু কারো কাছেই তেমন টাকা পয়সা নাই, সবার চিন্তাই ছিলো ‘কোথাও যাবো’ ধরনের, তাই আমরা সবাই ভ্যানতারা হয়ে এলোমেলোভাবে ট্রেনেই ঘুরতে থাকলাম। ট্রেনের হুইসেলের শব্দ সবচেয়ে মধুর মনে হলো ঐ রাতে। সারারাত ঠিক ঝিকঝিক করে ঝিমুনিসহ ঠিক কতদূর গেলাম বুঝলাম না। শুধু ট্রেনের ভেতর দূর থেকে খালি গলায় আসা গানের আওয়াজে চোখ খুলে দেখলাম ভৈরব নদীর ওপর রেলব্রিজে আঘাত দিয়ে আমরা সজোরে ছুটছি। সুন্দর রাত! চাঁদ গলে পড়া রূপালী রাত। ভোর হবার আগেই সবার ঘুম মোটামুটি ভেঙে গেলো, হাত পা আর ট্রেনের শরীর বাজিয়ে গান। চাঁদটা আমাদের সাথেই ছিলো কিন্তু হঠাৎ জানালা বেয়ে দেখলাম চাঁদটাকে ভৈরবের পরপরই রেখে এসেছি। এখন আকাশে মেঘ আর মুহূর্তেই বিদ্যুতের দাপটের আওয়াজ।

আমরা ঠিক করলাম ফেনী স্টেশনে নেমে পড়বো। এরপর বাসের ছাদে বড়তাকিয়া বাজার হয়ে প্রাথমিক দর্শন খৈয়াছড়াকে দেবো। কিন্তু উপস্থিত আটজন এরই মধ্যে খৈয়াছড়া কয়েকবার গিয়েছে। দুটো দল তৈরী হয়ে গেলো। এই যাবো, যাবো না গ্রুপের গঠনমূলক বৈঠকের পর আমরা তাকিয়ে দেখলাম ফেনী স্টেশন ফেলে চলে যাচ্ছি। ভোর বেলার সিনথেটিক রঙ আর মাথাভর্তি খৈয়াছড়ার পাহাড় ঝর্ণার চিত্রে শরীর ঝিমঝিম করতে থাকলো। এখন শুরু হলো বৃষ্টি। কী ‌ঝুম বৃষ্টি! রেলের এই আঁকাবাঁকা পথে ঠিক কতদূর এসেছি কেউই বুঝতে পারছিলাম না! বৃষ্টি এবং আধা-ভোর… সব মিলিয়ে সবাই একটা সিদ্ধান্তে স্থির হতে পেরেছি “চলো নেমে পড়ি!” এই চলো নেমে পড়ি স্লোগানের এক পর্যায়ে একটা ব্রিজের ওপর ট্রেনের গতি হঠাৎ কমে গেলো। ব্রিজের এক পাশে ‘সংস্কারের কাজ চলছে’ সাইনবোর্ড লেখা। ধুপ ধাপ নেমে পড়লাম আটজন। সে যে কী বৃষ্টি! ক্যাটস এন্ড ডগস ভঙ্গীতে আমরাও দৌড়ালাম। ঠিক এটা কোন জায়গা বুঝতে পারছি না। অন্ধকার… মাঠ, দূরে অশরীরির মতো গাছগুলা নাচছে। রেল লাইন পার হয়ে অনেকটা হেঁটে সারি সারি কটা মাটির ঘর নজরে আসলো… একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ঘণ্টাখানেক দাঁত ঠুকিয়ে কাঁপার পর ভোর হলো। ঘর থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা বের হলো। আমরা একটু আগুনের পাশে দাঁড়াতে চাই বলতেই উনি ওনার চালা ঘরে আমাদের নিয়ে গেলো। চা আর খিচুড়ি দিয়ে সকাল শুরু। সবই ঐ খালার কৃপা! সকাল হতে হতে জানলাম এটা কুমিরা। যাত্রা শুরু। ফারাবি ভাই বলল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ভেতর দিয়ে একটা গ্রাম আছে। তারপর পাহাড়। এই পাহাড়ের মাঝে একটা মাজার আছে। তোফায়েল শাহ‌’র মাজার। অল্প ক’জন লোকের যাতায়াত। আর দুজন লোক আছে দেখাশোনা করার জন্য। সোনাছড়িতে যেতে যেতে সেই অপূর্ব রাস্তা আর ঢেউ খেলানো ঝড়। মাজারে পৌঁছে সাধুদের সাথে মত বিনিময় করে খিচুড়ি বসালাম। এদিক ওদিকটা ঘুরতে ঘুরতে যে আবার রাত ঢলে এলো টেরই পেলাম না। রাতে একটা গানের আসর আর মাজারেরই সেবা নিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম এলোমেলো হয়ে। সকালে বেরিয়ে পড়লাম অন্য পথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে জান বের হয়ে যাবার উপক্রম। তেতানো রোদ আর উঁচু নিচু রাস্তা! আমাদের পেছন পেছন একটা কুকুরও জুটে গেলো। একটা গ্রামের একটা মসজিদের কাছাকাছি এসে সবাই হাত পা ধুয়ে অল্প বিরতি দিতেই সেখানকার লোকজন আমাদের খাবার দিলো বড় একটা গামলায়! সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং নেমে এলো। সোনাছড়া থেকে চিটাগং শহর অবধি আসতে আসতে সবাই হাফ বয়েল হয়ে গেলাম। এরপর আবার সবাই একদলে ভাগ হলাম। “কোথায় যাবো” দল। তরমুজ কিনে খেতে খেতে বিকেল গড়াতেই সিদ্ধান্ত হলো আমরা যাচ্ছি এবার বান্দরবানের আলীকদমে! ওহো, বলতে ভুলে গেছি যে, চট্টগ্রাম থেকে আমাদের সাথে যুক্ত হলো আরো তিনজন। তাদের মাঝে একজন প্রায় শিশু। সবে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে! চট্টগ্রাম থেকে চকোরিয়া বাসে এরপর নসিমনে চেপে আলীকদম! আলীকদমে পৌঁছে দেখি ঘুটঘুটে রাত। দোকানপাট অল্প কিছু খোলা। রাতের খাবার পেটে পুরেই হাঁটা দিলাম পাহাড়ের দিকে! শুরু হলো ঝড়। কী ভয়ানক ঝড়! ডাল-পালা ভাঙার শব্দ চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে মুড়ং পাড়ায় এসেই ভয়াবহ বৃষ্টি। একটা স্কুল ঘরের মতো ফাঁকা দোকানঘরে তাঁবু পেতে সবাই মোম জ্বালিয়ে বসে থাকলাম। বজ্রপাতের দাপটে চারপাশ ভেঙে-চুরে যেতে লাগলো যেনো। কী ভয়াবহ! এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে গেলাম। চোখ খুলে দেখি আমাদেরকে ঘিরে চারপাশে আরো অনেক অনেক ছোট ছোট অপরিচিত চোখ।ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে তাদের সাথে সামান্য মতবিনিময় হলো। তারা মুড়ং। পোশাকে তাদের ঐতিহ্য এবং বাংলাও তেমন জানে না... তবে আন্তরিকতার আসলে কোনো আলাদা ভাষা থাকে না। তারা আমাদের সাহায্য করলো। আমরা তাদের কাছ থেকে অনেকগুলো বোতলভর্তি পানি আর একটা হাঁড়ি পেলাম। তারা চাল ডাল আগেই কিনে রেখেছিলো। এসব নিয়ে এবার দিনের আলোয় ট্রেকিং। চোখ খুলে পড়ার মতো সৌন্দর্য। যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। আমাদের উদ্দ্যেশ্য মাড়ৈংতং। কত পথ যে হাঁটলাম ইয়ত্তা নেই। এর মাঝে একটা মাচাং পেলাম পাহাড়ের কোণে… কেউ বানিয়ে রেখেছে। সেখানেই কাঠখড় পুড়িয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন চললো। ঝাল লবণ ছাড়া খিচুড়ি। যা আছে তাই চাপিয়ে রান্না… ক্ষুধার পেটে অমৃত মনে হলো। খেয়ে মিনিট দশেক বসে আবার হাঁটা। সাঁঝ পেরিয়ে পৌঁছালাম মাড়ইংতং। খাবার আর পানি কিছুই নেই পর্যাপ্ত। পাহাড়ের চূড়ায় একটা বৌদ্ধমন্দির আর কূপ ছাড়া কিছুই নেই। গত রাতের বৃষ্টির পানি কূপে জমা পড়েছে। সেই পানি বোতলে পুরে নিয়ে মন্দিরের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। প্রচণ্ড বাতাস। তাঁবু খাটানোর জো নেই। এখানে ফারাবী ভাই আগেও এসেছিলেন। উনি বললেন, এখানে সবসময় বাতাস এমন। রাতে শুকনো খাবার খেয়ে এক আকাশ তারা নিয়ে মন্দিরের ভেতর তৃপ্তির ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠলাম। পাহাড়ের চারপাশ আরো ঘুরলাম। কী অবিরাম সুন্দর! খানিক পরেই একদল আদিবাসী শিশু সেখানে পূজো দিতে এলো। আমরা প্রসাদ খেয়ে মোটামুটি এনার্জি নিয়ে ট্রেকিং শুরু করলাম। সেই সব পেরিয়ে আবার আলীকদম! সেখান থেকে লোকাল ওয়েতে চান্দের গাড়ি করে মহেশখালী চলে এলাম। পথটা আঁকাবাকা আর নেশার মতো। দূরে দু’ একটা পাহাড় জ্বলছে। মহেশখালী থেকে বড়বাজারের একটা ম্যানগ্রোভে তিন ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপ! অদ্ভুতভাবে তখনও রাত। এক জেলের সাথে কথা বলে তার ঘরে সবাই থাকার জায়গা পেলাম। সবাই হতদরিদ্র। কিছু টাকার বিনিময়ে উনি ডাল ভাতও বসিয়ে দিলেন। সামান্য খেয়েই সবাই ছুটলাম সৈকতে! এ সমুদ্র তো টেকনাফ কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিন কিছুই নয়! এ এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। সারারাত সৈকতেই কাটিয়ে দিলাম তাঁবু গেঁড়ে। সারারাত সেই সমুদ্রেই বাতাস আর বালিতে পা দিতেই ঝলকে ওঠা জোনাকির মতো চিকচিকে আলো, কী অদ্ভুত! এমনটা আগে দেখিনি। ভাবিনি অবধি। সকালে রওনা হলাম ট্রলারে করে কক্সবাজার। কক্সবাজারের কাঁকড়া খেয়ে বাসের ছাদে চেপে চট্টগ্রাম।

কাপ্তাই গিয়েছিলাম তার দিন দুয়েক পরেই। বিজু উৎসবে। জলকেলি আর গজারি বনের একদল ডাকাতের সাথে কাটানো সেই গা ছমছমে রাতের গল্প আরেকদিন বলা যাবে। আপাতত এতটুকুই সুখের ঝুলি! অদ্ভুত বাংলাদেশ আর অদ্ভুত আমাদের গল্প!

0 comments

Leave a comment

Login To Comment