Image

রৌদ্রতপ্ত পানামে শুনি ইতিহাসের দামামা

নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিলাম বিয়ে খেতে। বড় চাচার মেয়ের বিয়ে। আমি আর আমার মাধ্যমিকে পড়া ছোট ভাই শোভন এই বিয়ের মহলে অকারণ খিলখিল হাসাহাসিতে মোটামুটি বিরক্ত সকাল থেকেই। বিয়ে বাড়ির মতো জায়গায় আমরা কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছি না। সেদিন খুব সকালে ওঠায় আমাদের হাতে ভালো সময় ছিলো। তো সকাল নয়টার দিকে আমি আর শোভন (আমার ছোট ভাই) বের হয়ে এলাম বাসা থেকে। শোভন আমার হাতে ক্যামেরা দেখেই চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো, “ভাই, কই যাইতেছো?” আমি ফেলুদার মতো ভাব নিয়ে ওকে বললাম, “একদম স্পিকটি নট, চুপচাপ আমাকে অনুসরণ করো।” শোভন সত্যিই রহস্যের গন্ধ পেতে শুরু করলো।

আমি আর শোভন এখন ফতুল্লা থেকে রওনা হলাম সাইনবোর্ডের দিকে। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য দশমী দেখা। ওহ! বলে রাখি, তখন ছিল পূজার সময়। আর নারায়ণগঞ্জ এ হিন্দু জনগোষ্ঠী বহু বছর ধরে মুসলিমদের সাথে পাশাপাশি বাস করছে কোনো প্রকার সংঘাত ব্যতীত। তাই নারায়ণগঞ্জে পূজা দেখার মজা ঠিক শাঁখারি বাজারের মতোই। আর তাছাড়া পাশেই তো নদী। শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা; You name it, Narayanganj have it. কিন্তু আমি ফেলুদা হয়ে যেটা ভুল করলাম সেটা হলো পূজা দেখার শখ করলাম সকাল বেলা। তাও আবার নারায়ণগঞ্জের দিকে না গিয়ে গেলাম সাইনবোর্ডের দিকে। বুঝে ফেললাম যে ভুল করে ফেলেছি তা আর শুধরাবার নয়। অন্তত এই সকাল সাড়ে নয়টায় তো নয়ই। সাইনবোর্ডের একটা শরবতের ভ্যানের সামনে আমি আর ভাই দাঁড়ানো, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ঠিক তখনি একদল মানুষ হুড়মুড় করে লোকাল বোরাক বাসের দিকে তেড়ে এসে উঠতে থাকলো, তন্মধ্যে একজন কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞাসা করলো, “ভাই, বাস পানাম যায় তো?”

আমি পানাম শব্দটা শুনে শোভনের হাত টান দিয়ে উঠে গেলাম বাসে। শোভন বলে উঠলো, “কী যে করতাছো মিয়া তুমি!” আমি তাকালাম ওর দিকে, কিছু বললাম না। হাসলামও না। উঠে গেলাম আমরা বাসে। যাচ্ছি বাসে। Google Map-এ বসে বসে রাস্তা দেখছি। একটু একটু করে যত আগাচ্ছি তত বলবো না যে, আগ্রহ বাড়ছে, বলবো তৃষ্ণা বাড়ছে। ৪০০ বছরের আগের ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে যাচ্ছি। সেই পথে হাঁটতে যাচ্ছি যে পথে আমার পূর্বপুরুষেরা বাণিজ্যের জন্যে পাড়ি জমাতো। কেউ হয়তো আসতো হাতে মসলিন নিয়ে। বারো ভুঁইয়ার এই রাজধানী ইংরেজরা তাদের নীল ব্যবসার জন্যে ব্যবহার করতো একসময়। এখনো প্রায় পরিত্যাক্ত।

ইতিহাসের সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আর বোরাক বাসে বসে ঘামতে ঘামতে হঠাৎ কন্ডাক্টর ডেকে উঠলো, “মোগড়াপাড়া নামেন। মোগড়াপাড়া। যারা পানাম যাবেন এইখানে নাইমা যান।” তারা হুড়মুড় করে নেমে গেলো। এতক্ষণ মুখ বন্ধ রাখার পর শোভন এবার কথা বলে উঠলো, “ভাই, কই আসলাম আমরা?” আমি বাস থেকে নামতে নামতে ওকে বললাম, “তুই আমাকে পরে থ্যাংকস দিবি।” শোভনের ভাবগতির কোন পরিবর্তন দেখলাম না। ওর মুখ সেই ফ্যাকাসেই রয়ে গেলো। আমি ভাবতে লাগলাম যে, ওর মাঝে কি আমি ‘Wanderlust’-এর সুপেয় বিষ ইঞ্জেক্ট করতে পারবো আদৌ? 

ভাবতে ভাবতে আমরা রিকশা নিয়ে নিলাম। মটরচালিত রিকশা আমাদের সোনারগাঁ জাদুঘরে নামাতে নিলে আমি বললাম যে, না আমরা পানাম আগে যাবো। রিকশাওয়ালা বিরক্ত মুখে রিকশায় দিলো টান। আমি ওসব তোয়াক্কা না করে ঘার্মাক্ত শরীরে বাতাস লাগিয়ে চললাম পানামের পথে। ৩-৪ মিনিটের দিকে পৌঁছে গেলাম পানাম।

বড় নগর, খাস নগর আর পানাম নগর। এই ত্রিনগরী মিলে ছিলো বারো ভুঁইয়ারদের প্রতাপ প্রতিপত্তি। কিন্তু বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে যিনি ছিলেন সব থেকে বেশি প্রভাবশালী, সেই ঈশা খাঁর রাজধানী এই পানাম নগর। আমরা জনপ্রতি মাত্র ২০ টাকার টিকেটে ঢুকে গেলাম পানাম নগরের ঐতিহাসিক দালান ঘেরা গলিপথে। আমার প্রথমেই যা চোখে পড়লো তা হলো বিল্ডিং-এর কারুকাজ। কী অসম্ভব সুন্দর সেসব ফুল, পাতা আর পরীর গঠন প্রতিটি বাড়িতে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা নয় এসব কিন্তু সিমেন্টের এরূপ কারুকাজ ৪০০ বছর আগের আধুনিকতাকেই বর্ণনা করে। সহজেই হিন্দু আর মুসলিম বাড়ি পৃথক করা যায়। হিন্দু বাড়ির চৌকাঠে কৃষ্ণ যপমন্ত্র লেখা। আর স্বভাবতই মুসলিম বাড়িতে ওসবের বালাই নেই। প্রতিটি হিন্দু বাড়ীর দোতলার এক কোণে কুঁড়েঘরের ঢঙে বানানো ঘর লক্ষণীয়। আমি ধারণা করেছি ওগুলো পূজোর ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ঢুকতেই একটা ছাদবিহীন একতলা ঘর দেখতে পাই। দুই

কক্ষের ঘর। লোকমতে ওটা মসজিদ। এমন মসজিদ আর ঘরে ঘরে মন্দির দেখে আঁচ করা যায় সহজেই যে, ব্রিটিশদের "Divide and Rule"-এর পূর্বে এবং পরেও এই বাঙ্গাল মুলুকে হিন্দু মুসলিম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে বসবাস করতো, বাণিজ্য করতো। কোলকাতার মতো এতো রেষারেষি ছিল না বোধ করি। ১০০ খানা দালান। প্রত্যেকটিই একদিন সারাদিন দেখেই পার করে দেয়া যায়। চেকারবোর্ড-এর মেঝে দেখে সেই সময়ের মানুষের রুচির তারিফ না করে পারি না। হাঁটতে হাঁটতে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে উঠেই গেলাম একটি বাড়ির ছাদে। দেখলাম পাশেই একটা নদীর মতো। পানামের এই দালানঘেরা রাস্তার দুই পাশেই বহমান মেঘনা ও শীতলক্ষ্যার শাখা নদী। এই নদী দিয়ে ঈশা খাঁর বাড়িতে যাওয়া যায়।

শোভন ও আমার দুজনেরই চোখ ছানাবড়া এবং এমন যেন "Our jaws dropped"। শোভন তো

জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে বলেই ফেললো— এই মেঝেই একদা রাতে নর্তকীদের পদের তালে সুরের মূর্ছনায় মুখরিত থাকতো। আমি ওর কাঁধে হাত দিয়ে মনে মনে বললাম, তোর মধ্যেও Wanderlust ইঞ্জেক্ট করলাম। মুখে বলে উঠলাম, “সাবাশ তোপসে!” 

এদিকে মুঠোফোনের ঘণ্টা বেজে উঠলো। আমাদের উপর বিয়ের ফুল আনার গুরুদায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো যা আমরা বেমালুম ভুলে ইতিহাসের অমোঘ সুধা পানে ব্যস্ত। আমরা তড়িঘড়ি করে নারায়ণগঞ্জের পথে রওনা হলাম। অসম্ভব সুন্দর একটা দিন কাটলো বলবো না; বলতে হবে যে, সারাজীবন বলার মতো একটা গল্প সাথে করে নিয়ে যাচ্ছিলাম বাসে করে এবং আজ এই কী-বোর্ডের ক্লিক ক্লিক-এর মাধ্যমে শুনিয়েও দিলাম।

পানাম সেই ৮০০ বছর আগেও যেমন রাতে বড় গেট আটকানোর মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যেত বাইরের দুনিয়া থেকে এখনো বন্ধ হয়ে যায়; শুধু গেটটি নেই। আমি পূর্ণ জোছনায় এই পানাম-এর চেকারবোর্ড মেঝে নিজ চোখে দেখার তৃষ্ণা অনুভব করি এখনো। সে তৃষ্ণা নিয়ে আমি পরলোক গমন করতে চাই না। কিন্তু হয়তো নিয়তির পরিহাস মেনে নিতেই হবে।

0 comments

Leave a comment

Login To Comment