Image

সিক্কিম রাজ্য— অনন্য ভ্রমণ

ভ্রমণ করতে ভীষণ ভালোবাসি, নতুন নতুন জায়গার প্রতি আকর্ষণ বেশি।

এবারের ভ্রমণ ছিলো ইন্ডিয়ার সিক্কিম রাজ্য। যা বেশ ক’মাস হলো সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে।

আমাদের দেশের বেশ কিছু ট্রাভেল এজেন্সি বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণের আয়োজন করে থাকে, সেটাও সবার জানা। তবে অনেকেই আছেন যারা নিজেরাই ভ্রমণ করতে চান। আমরাও এর ব্যতিক্রম নই, তাই আমরা দু’জন হুট করেই সুযোগ পেলে দৌড় দেই।

ভ্রমণকাল ৩১ মে থেকে ৪ জুন, ২০১৯। ছুটি-ছাটার ঝামেলার কারণে ঈদের আগের ক’দিনের ছুটিকে কাজে লাগালাম। আমার শ্বশুরবাড়ি রংপুরের সৈয়দপুরে, তাই ভ্রমণ শুরু করেছিলাম সেখান থেকেই।

৩১ তারিখ ভোর ৭টায় লোকাল বাসে করে যাত্রা শুরু করলাম। দুপুর ১২টায় আমরা  বাংলাবান্ধা বর্ডারের কাজ শেষ করে ইন্ডিয়ায় ঢুকি, বর্ডারের বাইরে অটো পাওয়া যাবে, ফুলবাড়ি পর্যন্ত ৫-১০ রুপি জনপ্রতি। ফুলবাড়ি থেকে শিলিগুরি স্ট্যান্ড অটো অথবা ৮ সিটার মাহেন্দ্র পাওয়া যায়, জনপ্রতি ২০ রুপি খরচ পড়বে। এছাড়া কেউ চাইলে রিজার্ভ করেও যেতে পারবেন, খরচ বেশি পড়বে।

বাংলাবান্ধা থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব ২০ মিনিটের, আমাদের প্রথম জার্নিটা একটু রাফ হবার কারণে ২ জন একটা ট্যাক্সি রিজার্ভ করে সরাসরি গ্যাংটকের জন্য, মাঝে রংপো চেকপোস্ট-এ ইনার লাইন পারমিশন নিতে হয়। ভীড় না থাকায় ১০ মিনিটে কাজ হয়ে যায়। প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেছি সিক্কিমের রাজধানী গ্যাংটকে, তখন সন্ধ্যা ৭টা ৩০। এম-জি মার্গ এবং আসেপাশে অনেক হোটেল আছে, ইন্ডিয়াতে SUMMER-এর ছুটি থাকার কারণে প্রচুর ভীড় ছিলো, অন্য সময়ে গেলে ১০০০-১৫০০ রুপীতে ভালো রুম পাওয়া যায়।

বাংলাদেশীদের জন্য বিশেষ কিছু টিপস্:

১। যাবার আগেই ১৫ কপি করে ভিসার ফটোকপি, পাসপোর্টের ফটোকপি এবং ছবি ২০ কপি নিয়ে যাবেন।

২। ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকা থেকেই দিয়ে যাওয়া ভালো। সোনালি ব্যাংক মতিঝিল ছাড়া নিউ মার্কেট শাখাতেও দেয়া যায়। ৫০০ টাকা।

৩। গ্যাংটক পৌঁছাতেই অনেক ট্রাভেল এজেন্সির অফিস চোখে পড়বে, আগে গিয়ে খোঁজ নেবেন কোন কোন জায়গা দেখার পারমিশন দিচ্ছে। কারণ পারমিশনটা ওখানকার আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে।

৪। সিক্কিম ভ্রমণে অবশ্যই কমপক্ষে ৬ জন যাবেন, তাহলে খরচটা শেয়ারিং-এ কম পড়বে।

৫। সিক্কিম অনেক গোছানো শহর এবং তাদের নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে, সেগুলো মানতে হয়।

৬। নর্থ সিক্কিম পুরাটাই বর্ডার, মিলিটারি এরিয়া, তাই যতটা সম্ভব সংযত থাকার চেষ্টা করবেন।

৭। মিলিটারি এরিয়াতে কেউ ছবি তোলার চেষ্টা করবেন না। ঝামেলা হতে পারে।

৮। নর্থ সিক্কিম প্রায় সারা বছরই শীত, তাই গরম কাপড় সাথে রাখবেন।

(বিঃদ্রঃ এপ্রিল-মে এবং জুন এর মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল, প্রচুর টুরিস্ট থাকে, জুন ১৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকাল, এই সময়ে নর্থ সিককিম পুরোপুরি বন্ধ থাকে)

প্রথমদিন, ১ জুন, আমরা কোনো বাংলাদেশী না পাবার কারণে কিঞ্চিৎ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল, তাই সময় নষ্ট না করে সকালে লোকাল ট্যাক্সিস্ট্যান্ড থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সাইট সিন-এ বের হই। দারুণ সব যায়গা। আর গ্রীষ্মকালের জন্য অসংখ্য ফুলের দেখা মিলেছিল। আহ! এক কথায় অসাধারণ।  এর ভেতর, ২টা বিখ্যাত মনেস্ট্রি, তাশি ভিউ পয়েন্ট, রোপ ওয়ে (ক্যাবলকার), মন্দির, ঝর্ণা, আর অসাধারণ সব ফুলের সমারোহসহ মোট ১০টা প্রধান স্থান দেখে সন্ধ্যায় হোটেলে আসি।

২ জন হবার কারণে কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম, বাংলাদেশী অন্য কোনো গ্রুপ পাচ্ছিলাম না। ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে ১টা কাপল পেয়ে গেলাম, এক এজেন্সির সাহায্যে। তারাও আমাদের মতো গ্রুপের সন্ধানে ছিল। ২ জুন, আমরা ২ কাপল মিলে লাচুং যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম, এম-জি মার্গের ঠিক নিচের রোড এই SUNFLOWER TOURS & TRAVELS  আছে, ওখানে বাংলাদেশীদের ভালো হেল্প করা হয়।

৪ জনের জন্য মোট ১৭ হাজার রুপিতে লাচুং ভ্রমণের পারমিশনসহ সব ঠিক হয়।

বলে রাখা ভালো লাচুং যাবেন আর জিরোতে যাবেন না? তাহলে তো পুরাটাই মিস। জিরোতে যেতে আলাদা পারমিশন নিতে হয় লাচুং থেকে। সেটার জন্য আলাদা ফি দিতে হয়, অনেকটাই ড্রাইভারের উপর দাম নির্ভর করে।

লাচুং যাবার পথটা নিজে না দেখলে শুধু বলে বোঝানো যাবে না, কখনো মেঘ ছুঁয়ে দেবে, কখনো পাহাড়ি ঝর্ণা গাড়ির উপর পড়বে বৃষ্টির মতন। এছাড়াও ৫ থেকে ৬টা স্পট ড্রাইভার যাবার সময় দেখিয়ে নিয়ে যায়, সবগুলোর নামও মনে নাই।  আমরা যখন লাচুং-এ হোটেলে পৌঁছালাম তখন সময় ৬টা ৪০।

Sunflower-এর নিজস্ব হোটেল, একদম শেষ সীমানায়। অসাধারণ ভিউ, চারপাশে পাহাড়, পাহাড়ের চূড়াতে বরফঢাকা। আহ! কী শান্তি।

এই ভ্রমণে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, সন্ধ্যার চা, পরদিন সকালের নাস্তা (নুডুলস), দুপুরের খাবার, গাড়ি এবং রুম— সব কিছুই ১৭ হাজার রুপিতে ছিল।

জিরো না গেলে শুধু ইয়ামথাং ভ্যালি ঘুরিয়ে আবার গ্যাংটকের জন্য রওনা দেয়া হয়। 

৩ জুন, সকালে সরাসরি জিরোতেই আগে গেলাম, বাড়তি ৩ হাজার রুপি দিয়ে জিরো পয়েন্ট দর্শন করেছিলাম। গিয়ে বুঝলাম সত্যিই জিরো না দেখলে অনেক কিছুই বাকি থাকতো। পুরোটা জায়গা জুড়ে সাদা বরফে ঢাকা, জিরো দেখে ফেরার পথে ইয়ামথাং ভ্যালি ঘুরে অসম্ভব সুন্দর কিছু স্মৃতি সাথে নিয়ে আবার রওনা হলাম।

লাচুং-এ হোটেলে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। রাত ৮টায় আবার গ্যাংটকের হোটেলে চেকইন, এমজি মার্গে ঘোরাঘুরি করে, ডিনার করে রুমে।

পরদিন, ৪ জুন  সকালে ট্যাক্সি নিয়ে দেরুলিয়া স্ট্যান্ড, সেখান থেকেই মূলত ইন্টার সিটি গাড়ি, ট্যাক্সি ছাড়ে, জনপ্রতি ৩০০-৪০০ রুপিতে গ্যাংটক থেকে শিলিগুড়ি জিপগাড়ি/শেয়ারিং ট্যাক্সি ছাড়ে, আমরা ২ জন শেয়ারিং জিপে শিলিগুড়ি পৌঁছাই। শিলিগুড়ি থেকে অটো নিয়ে সরাসরি বর্ডারে। বর্ডারে সব কাজ শেষ করে বের হলেই লোকাল বাস। বাসে করে পঞ্চগড়, পঞ্চগড় থেকে সৈয়দপুরের বাস।

 সন্ধ্যায় সৈয়দপুর পৌঁছে পরদিন পরিবারের সাথে ঈদ।

 (বিঃ দ্রঃ বাংলাদেশীদের জন্য শুধু মাত্র লাচুং (নর্থ সিক্কিম), সাইট সিইন, আর ছাংগু লেক ভ্রমণের পারমিশন দেয়া হয়)

সবশেষে, নিজের দেশকে ভালোবাসুন, অন্যের দেশকে অন্যের ধর্মকে সন্মান করুন, পৃথিবীর যেখানেই ভ্রমণ করবেন, পরিছন্ন রাখার চেষ্টা করবেন।

0 comments

Leave a comment

Login To Comment