Image

নাটোরের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লার খোঁজে

“নাটোরের কালীবাড়ির কাঁচাগোল্লা বিখ্যাত; না খেলে জন্মটাই বৃথা”— তুরাবার মুখে এমন কথা শুনে  সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম। শীতকালের শুরু, ২০১৯ সালের  ডিসেম্বর মাস। ঠিক হলো ৫ বন্ধু মিলে যাবো বিখ্যাত কাচাগোল্লার রসে নিজেদের সিক্ত করতে। আর তার সাথে যদি জীবন বাবুর বনলতাকে খুঁজে পাওয়া যায়, তবে তো সোনায় সোহাগা। কলাও খেলাম, রথও দেখলাম।

তো, ডিসেম্বরের ৪ তারিখ সকাল ১০টায় ট্রেনে চড়ে বসি নাটোরের পথে।

তুরাবাকে কিছুক্ষণ পর পরই মিতুল বলে— দোস্ত, যদি টেস্ট না পাই খবর আছে; যাওয়া-আসার সব খরচ উসুল করে ছাড়বো। মনে রাখিস।

—মনে রাখবো। তুইও কথা দে, যদি খেয়ে শান্তি পাস, খুলনার চুই ঝাল খেতে নিয়ে যাবি আমাদের।

—সেটা দেখা যাবে, আগে চল কাঁচাগোল্লাকে পাকা করি

হঠাৎ সবাইকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে রাজিন শুরু করলো কাচাগোল্লা আবিষ্কারের গল্প— “অনেক বছর আগের কথা, তখন রানী ভবানীর রাজত্বকাল। রানীকে নিয়মিত মিষ্টি পাঠাতো এক মিষ্টির দোকানদার। একবার হইলো কী, মিষ্টির কারিগর আসেনি! ওদিকে মিষ্টি তৈরির দুই মণ ছানা কেটে রাখা! মালিক পড়ে গেলো মহা চিন্তায়। ছানা নষ্ট হওয়ার ভয়ে সে চিনির শিরায় ঢেলে নাড়তে জমিয়ে রাখে। তারপর খেয়ে দেখে খারাপ লাগছে না। বেচারা ভয়ে ভয়ে রানীর কাছে সেটাই পাঠিয়ে দেয়। খেয়ে তো রানী মহাখুশি। পরে এর নাম দেয়া হয় কাঁচাগোল্লা…” সবাই শুনে মুগ্ধ হয় এই ইতিহাস জেনে।

হয়তো ইতিহাসের ধাক্কাতেই ঘুম ভাঙে প্রায় শুরু থেকেই ঘুমিয়ে থাকা রাফির। বললো— তোদের চিৎকারে ঘুমাবার উপায়ও নেই। সারাদিন শুধু খাই খাই।

Òতো, ঘুরতে বের হয়ে তোর মতো নাক টেনে ঘুমাবো নাকি রে গন্ডারের মতোÓ— বললো সেজুতি।

এভাবে কথার মারামারি করতে করতে বিকেলে আমরা পৌঁছে যাই নাটোর স্টেশনে।

স্টেশনের পাশে একটা হোটেল পেয়েই দুপুরের খাবারটা খেয়ে ফেলি, যেন কতকাল খাইনি। তারপর শুরু হয় আসল গন্তব্যে যাত্রা। কারণ নাটোরে কাঁচাগোল্লার অনেক দোকান থাকলেও আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছি যাবো জয়কালিমন্দির মিষ্টান্ন ভান্ডারে। অর্থাৎ যেতে হবে লালপুর। অনেক ঘুরে জিজ্ঞেস করে করে যখন আমরা খুঁজে পেলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। আমরা তো মহাখুশী। যেন খুঁজে পেয়েছি হারানো গুপ্তধন।

জয়কালী মন্দিরের পাশে লাগোয়া দোকান। প্রচুর ভিড় লেগে আছে। অর্ডার দিতে গিয়ে বুঝলাম কেন এত নাম এই দোকানের। হাফ কেজির উপরে কেনা যাবে না। প্রায় ঘণ্টা খানেক লাগবে পেতে। দুই বন্ধু ক্লান্ত হয়ে ষ্টেশনে চলে গেলো। রাজিন, আমি আর মিতুল অপেক্ষা করলাম। হঠাৎ দোকানের ভেতর থেকে একজন একটি প্লেট এগিয়ে দিলো। প্লেটে কাঁচাগোল্লা; বলল— আপনারা মনে হয় ঢাকা থেকে এসেছেন? নেন আপা টেস্ট করেন। খুব আগ্রহ নিয়ে চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বাদ পাবো সেই আশা নিয়ে মুখে নিলাম এক চামুচ কাঁচাগোল্লা। এর পরের কথা আমাদের চারজনেরই এরকম, Òনাটোরের কাচাগোল্লা না খেলে জন্মটাই বৃথা হতো রে দোস্ত!Ó

নাটোরের কাচাগোল্লার সুনাম দেশব্যাপী হলেও মূলত যারা এই কাচাগোল্লা বানানো শুরু করেছিল আর অনেকদিন ধরে কাঁচাগোল্লাকে বিখ্যাত করে তুলেছে সেই দোকান এই দ্বারিকভান্ডার। আপনারা অবশ্যই জীবনে একবার হলেও খেয়ে আসবেন এই দোকান থেকে।

এরপর আমরা বনলতাকে খুঁজতে বেরিয়ে আবিষ্কার করি আরো দর্শনিয় স্থান। সেই গল্প আবার একদিন করবো। আজ বিদায়।

0 comments

Leave a comment

Login To Comment