Image

বাংলাদেশের বিচিত্র লোকজ মেলা

ঋতু বৈচিত্রের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ । হেমন্ত থেকে চৈত্র মাস পয’ন্ত বাংলাদেশের আবহাওয়া মোটামুটি নাতিশীতষ্ণ । এই সময়টুকুই ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময় । ছুটি এলে মনটা কেমন যেন হয়ে উঠে ৷ মনে পড়ে শৈশবের সেইসব ধূলিধুসর, রৌদ্রমাখা দিনগুলোর কথা ৷ মনে পড়ে যায় আমার প্রিয় গ্রামের কথা, গ্রামের হাট-বাজার, যাত্রাপালা, নাগরদোলা আর হ্যাঁ, মেলার কথা ৷ নানারকম, বিচিত্র সব মেলার কথা কি আপনাদের মনে পড়ছে?

ওই যে দূরের সবুজ গ্রামটা ৷ সেখানে বিশাল ছাতার মতো একটা অশ্বত্থ গাছ আছে ৷ কী ছায়া সুনিবিড় শান্ত শ্যামলিমায় ঢাকা সব কিছু ৷ গ্রীষ্মের উষ্ণ দুপুরে সবটুকু প্রশান্তি যেন সেখানে ছড়িয়ে রাখে ৷ গাছটির চারপাশ মাঠের মতো সমতল ৷ বৈশাখে ওখানে সপ্তাহব্যাপী মেলা বসতো ৷ গ্রামের মানুষ জায়গাটির নাম রেখেছে কালিতলা ৷ মেলা শুরু হওয়ার মাসখানেক আগেই গ্রামে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেতো ৷ পাশের গ্রামগুলোতে কামার, কুমার, ছুতার, জেলে, তাঁতি সবাই ব্যস্ত সময় পার করতো ৷ ওদিকে যাত্রাদল, গায়কদল, কবিয়াল – এঁদেরও দু'দণ্ড সময় নেই ৷ নতুন নতুন যাত্রাপালার পরিকল্পনা নিয়েই সময় কাটতো তাঁদের ৷ চারদিকে কেমন যেন উৎসবের আমেজ ৷ সব বয়সি মানুষ অপেক্ষা করে থাকতো ঐ মেলার জন্য ৷ কি মনে পড়ছে আপনাদের সে রকম কিছু মেলা দেখার (মেলা ভ্রমণের) কথা? আর বছরের শুরুতেই বাংলা বর্ষবরণকে কেন্দ্র করেই এই জনপদে সবচেয়ে বেশি মেলার আনুষ্ঠানিকতা চোখে পড়ে ৷ সময়ের বিবর্তনে শুধু মেলার আনুষ্ঠানিকতায় কিছু পরিবর্তন এসেছে বৈকি ৷ আবার সংখ্যায়ও যে কিছুটা কমেছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায় ৷

আসলে এই বঙ্গিয় ব-দ্বীপ জনপদে মেলা একটি উপলক্ষ্য মাত্র ৷ মেলাকে ঘিরে যে আয়োজন তা বহুধা বিস্তৃত এবং বর্ণাঢ্যতায় ভরা ৷ শেকড়ের এসব বিনোদন যুগ যুগ ধরে আমাদের সাংস্কৃতিক ধারাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে ৷ মেলার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ যাত্রাপালা ৷ রাত একটু গভীর হলেই শুরু হতো যাত্রানুষ্ঠান ৷ একসময় জনপ্রিয় ছিল রহিম রূপবান, সিরাজউদ্দৌলা, বেদের মেয়ে জোৎস্না ৷ কোথাও কোথাও বসত পালা গানের আসর ৷ তবে যে কোনো লোকজ মেলায় নাগরদোলা এখনো অনিবার্য ৷ মেলায় সব ধরনের পণ্যই সহজলভ্য ৷ একটা সময় ছিল যখন মানুষ পণ্য আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে মেলাকেই বেছে নিয়েছিল ৷ সময়ের বিবর্তনে সেসব এখন বদলে গেছে ৷ তবুও মেলা কেন্দ্রিক উৎসবের আমেজ এখনো কোথাও কোথাও লক্ষ্য করা যায় ৷ দেশের উত্তর জনপদে কোনো কোনো মেলার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করা হয় নাইওরি নেবার জন্য ৷ মেলা উপলক্ষ্যে বিশেষত মেয়ে-জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয় ৷ নতুন জামা-কাপড় দেওয়া হয় ৷ এটা কোনো কোনো এলাকার আঞ্চলিক রীতি ৷

মূলত বৈশাখে বর্ষবরণকে কেন্দ্র করেই মেলা ও নানামাত্রিক উৎসবের আয়োজন করা হয় ৷ এই মাসে মেলার আবেদনটা একটু ভিন্ন ৷ কিন্তু শুধু বৈশাখেই নয়, আমাদের দেশে মেলার পরিধি বর্ষব্যপি ৷ তথ্য মতে, একসময় সারাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩০০ মেলা অনুষ্ঠিত হতো ৷ তবে এই সংখ্যাটি শতভাগ নিশ্চিত কিছু নয় ৷ কারণ, মেলা একটি চলমান প্রক্রিয়া ৷ সময়ের বিবর্তনে বদলে যেতে পারে এর স্থান, পরিধি, সময়কাল ও উপলক্ষ্য ৷ আবার কিছু কিছু মেলা হঠাৎ করে বন্ধও হয়ে যেতে পারে ৷ শুরু হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কোনো মেলা ৷ বর্তমান প্রেক্ষাপটে মেলার জন্য বটতলা বা পুর্বনির্ধারিত কোনো স্থানের প্রয়োজন না-ও হতে পারে ৷ সবকিছু মিলিয়ে মেলা এতটাই বিবর্তিত একটি সাংস্কৃতিক মাধ্যম, যার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া অনেকটাই দুঃসাধ্য ৷ কারণ, একটি মেলার ধারাবহিকতা নির্ভর করে সেখানকার আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর ৷ আয়োজকদের সদিচ্ছা, আর্থিক সঙ্গতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি বিষয়গুলো তখন মুখ্য হয়ে ওঠে ৷ এসব কারণে মেলা ধারাবাহিকতা হারায় ৷ বদলে যেতে পারে মেলার সময়কাল এবং পরিধিও ৷

আধুনিক যুগে মেলার রকমফের বেড়েই চলেছে ৷ শিল্পমেলা, ভ্রমণ মেলা, খাদ্য মেলা, বৃক্ষ মেলা, বাণিজ্য মেলা, বসতি মেলা, কম্পিউটার মেলা, মৎস্য মেলা, আয়কর মেলা, ফার্ণিচার মেলা, পাখি মেলা, কৃষি যন্ত্রপাতি মেলা, বইমেলা, পৌষ পিঠা মেলা ইত্যাদি নানা রকমের মেলার আয়োজন হতে দেখা যায় ৷ এই সবের কোনো কোনোটিতে প্রবেশ উন্মুক্ত, কোনো কোনোটি নিয়ন্ত্রিত ৷ কোনোটি শুধু নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পৃক্ত করতে কিংবা যুবসমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও আয়োজন করা হচ্ছে ৷ এক্ষেত্রে পয’টন মেলার কথাও উল্লেখ করা যায় ৷ এছাড়া কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, চামড়াশিল্প ইত্যাদির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বা আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান তৈরির জন্য এসব পণ্যভিত্তিক মেলাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৷ পণ্যভিত্তিক এসব মেলা আমাদের নগর সংস্কৃতিতে যোগ করছে ভিন্ন মাত্রা ৷ এসব মেলার ব্যাপ্তিকালও নানামাত্রিক ৷ একদিন থেকে শুরু করে একমাসও হতে পারে ৷ যেমন ঢাকার আগারগাঁয়ে প্রতি বৎসর আয়োজন করা হয় মাসব্যাপি আন্ত'জাতিক বাণিজ্য মেলার । এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিরোনামে পণ্যভিত্তিক মেলাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৷ তাতে স্থানীয় মানুষ ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হবার সুযোগ পাচ্ছে ৷ এখন নতুন ভাবে যুক্ত হয়েছে পয’টন মেলা, যদিও তা খুবই সীমিত পযা’য়ে আছে ।

মেলা যদিও আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটা অংশ, তবু মেলাকেন্দ্রিক কিছু সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান গড়ে উঠেছে ৷ এগুলো আমাদের বিনোদনধারাকে উর্বর করেছে ৷ পয়লা বৈশাখের কথাই ধরা যাক ৷ এ উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত মেলায় কি শুধু জিনিসপত্র বেচা-বিক্রি চলে? অবশ্যই নয় ৷ যাত্রা প্রদর্শনী, পুতুলনাচ, পালাগান, কবিয়ালদের আসর থেকে শুরু করে হেন অনুষ্ঠান নেই, যা দেখা যায় না ৷ কারণ, এসব হচ্ছে মেলার বাড়তি আকর্ষণ ৷ সবাই তো আর মেলায় কেনাকাটা করতে যায় না, কেউ কেউ আনন্দ উপভোগ করতেও সেখানে যায় ৷ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এই যে মেলার উপস্থিতি, তার ইতিহাস বেশ পুরনো ৷ এখন হাতের কাছেই সব ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে ৷ ইচ্ছেমতো ছবি দেখা, গান শোনা, গেম খেলা, এমনকি ইন্টারনেটের বদৌলতে গোটা পৃথিবীর সুন্দরতম স্হানসমূহ ঘুরে আসা যায় ৷ আজ থেকে একশ' বা দু'শ' বছর আগেও মানুষ কি এ সবের কথা ভাবতে পেরেছে? তবু থেমে থাকেনি মানুষ ৷ বরং যেটুকু উপভোগ করেছে, তা মন-প্রাণ দিয়ে করেছে ৷ আর মেলাকেন্দ্রিক বিনোদনই ছিল তখন সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ৷ মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্তরা প্রায় সারা বছর ধরে মেলার অপেক্ষায় থাকতো ৷ মেলার সময় কেনাকাটা বা বেচা-বিক্রি হবে, আমোদ-ফূর্তি হবে ৷ এমন নির্মল আনন্দের দিন বছরে একবারই তো আসে ৷ মানুষ এখন যাত্রার পরিবর্তে মঞ্চনাটক, কিংবা টিভি-সিনেমাতেই বেশি আসক্ত এবং বত’মান তরুণ সমাজকে দেশ ভ্রমণ তো নেশার মতো পেয়ে বসেছে ৷

কিছু কিছু মেলা স্থানকেন্দ্রিক ৷ প্রসঙ্গত পীর-আউলিয়াদের দরগাহকেন্দ্রিক মেলার কথা বলা যায় ৷ প্রথম দিকের মেলাগুলো সাধারণত যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধাজনক অবস্থানেই অনুষ্ঠিত হতো ৷ চৌরাস্তার মোড়ে, নদীর তীরে, রেলস্টেশনের কাছে ৷ অর্থাৎ যেখানে খুব সহজেই মালামাল পরিবহন করা যেতো, যাতায়াত করা যেতো সেখানেই মেলা বসত ৷ ব্যতিক্রমও অবশ্য রয়েছে কিছু ৷ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক মেলা মানুষের বিশ্বাস ও লৌকিকতাকে কেন্দ্র করেই এবং যথাযথ প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ৷ যেমন বটতলার মেলা, কালীতলার মেলা, নদীর মোহনার মেলা ৷ এ সবও কিছু অনানুষ্ঠানিক ধারণা থেকেই সৃষ্ট ৷ বটতলায় যদি খোলা প্রাঙ্গণ থাকে, চারদিকে যাতায়াতের জন্য রাস্তা থাকে, চমৎকার ছায়া পাওয়া যায়, বটবৃক্ষকে যদি দেবতুল্য মনে করা হয়, তাহলে এর নীচে মেলার আয়োজন করতে দোষ কোথায়? প্রচলিত অনেক ধ্যানধারণা থেকেও মেলার স্থান নির্ধারণ করতে দেখা গেছে ৷ সাধারণতঃ তীর্থস্থান নয়, কিন্তু ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন জায়গায়ও মেলা বসতে দেখা যায় ৷ বারুণী স্নান ধর্মীয় বিষয়, সেখানেও পুণ্যার্থীদের ভিড় জমে ৷ অনাকাঙ্খিতভাবেই মেলার পরিবেশ তৈরি হয় ৷ রথযাত্রা, দুর্গাপূজা এসব উৎসবে প্রচুর লোকসমাগম হয় ৷ ফলে এখানেও মেলা বসে ৷ দেশের ঐতিহ্যবাহী বড় পরিসরের বেশ কিছু মেলা আপনাদের জ্ঞাতাথে’ জানিয়ে দিচ্ছিঃ-

তাঁর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেঃ নারায়নগঞ্জের পুরাতন বম্ম্রপুত্র নদের পাড়ে লাঙ্গলবন্দে হিন্দু ধমা’লম্বিদের অষ্টমী স্নান উপলক্ষে মেলা, শিব চতুদশী’ মেলা, মহেশখালীর আদিনাথের মেলা, সুনামগঞ্জের যাদুকাটার লাউড়ারগড় মেলা ও চাপাইনবাবগঞ্জের শাহ নিয়ামত উল্লাহ (রহঃ) এর দরগাহে ওরশ উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত মেলা অন্যতম ৷ এই মেলাগুলোতে লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়ে থাকে ৷ মেলায় মানুষের সম্পৃক্ততা কতটা আন্তরিক ও গভীর হতে পারে, তার বড় উদাহরণ এই মেলাগুলো ৷ অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এসব মেলায় ৷ কিন্তু আমাদের জনপদে ঐতিহ্যবাহী এসব মেলা ভালোভাবে টিকে থাকলেও, কিছু কিছু মেলা একেবারেই হারিয়ে গেছে ৷

ইদানীং মেলার নামে সারাদেশে অনেক অসংগতিপূর্ণ ও অসামাজিক কার্যকলাপ হতে দেখা যায় ৷ তাতে মেলার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ৷ পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে ৷ নিশ্চয়ই কেউ তার পরিবার নিয়ে অশ্লীল নৃত্য আর জুয়ার আসরে যাবেন না ৷ এটা আসলে এক ধরনের অবক্ষয় ৷ মেলা তো একটি নির্মল আনন্দের জায়গা ৷ সেই আনন্দের উপকরণগুলো অবশ্যই সমাজমনস্ক হতে হবে ৷ বড় জোর সেখানে শিকড়ঘনিষ্ঠ বিনোদনের পাশাপাশি আধুনিকতাও যুক্ত হতে পারে ৷ তরুণ সমাজ সেসব মেলা সম্পর্কে বিশদ জেনে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় মেলার আয়োজন করতে পারেন ৷ এসব মেলার মধ্য দিয়ে আমাদের লোকসংস্কৃতির বর্ণাঢ্য ও বহুমুখী চিত্রগুলো আবার নতুন করে ফিরে আসবে ৷ এটা হলো একটি সুস্থধারার চর্চা ৷ তারুণ্যের ভেতর দিয়েই এই চর্চার প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করা প্রয়োজন ৷ নিজের ঐতিহ্য সম্পর্কে না জানলে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায় ৷ দেশের তরুণ সমাজ যেমন করে দেশের ঐতিহাসিক স্হানসমূহ ভ্রমণের মাধ্যমে দেশবাসীকে ভ্রমণের বিষয়ে উদভোদ্ধ করছেন, তেমনিভাবে তরুণ সমাজ লোকজ এই সকল মেলাকে ঘিরে তাঁদের সম্পৃক্তা বাড়ালে মেলা গুলো যেমন প্রাণচাঞ্চলতা ফিরে পাবে, তেমনি আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আবার ফিরে আসবে এবং বিদেশীরাও এসব মেলা উপলক্ষ্যে আমাদের দেশ ভ্রমণে আসবেন ।

দেশের পুরনো মেলাগুলো যেন যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে তার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সমূহের বিশেষ করে সংস্কৃতিক মনত্রনালয় ও বাংলাদেশ পয’টন করপোরেশনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন ৷ বিভিন্ন অঞ্চলের লুপ্তপ্রায় মেলাগুলোর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে সেই মেলাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা উচিত, থাকা উচিত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাও ৷ মেলাগুলো যেন যথাযথ সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে সেজন্য প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন ৷ সব জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি মেলা কমিটি থাকা উচিত ৷ মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে সেই কমিটির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে ৷ সরকারি এবং বেসরকারি যৌথ উদ্যোগই পারবে আমাদের মেলাকেন্দ্রিক একটি ঐতিহ্যবাহী সুস্থ বিনোদনধারা ফিরিয়ে আনতে ৷ এই ধরনের বিনোদন মাধ্যম আমাদের তরুণ সমাজকেও বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করবে ৷

বাংলাদেশ ‘মেলার দেশ’ হলেও গ্রামীণ মেলার সেই জৌলুস দিন দিন কমে আসছে । কমছে মেলার সংখ্যাও । আগে গ্রামাঞ্চলে বা বিভিন্ন তীর্থস্থানে আয়োজক কমিটির ব্যবস্থাপনায় যেভাবে মেলার আয়োজন হতো- এখন তা আগের মতো হয় না । এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু দায়িত্ব পালন ছাড়া সরকারীভাবে গ্রামীণ মেলাকে তেমন পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় না বললেই চলে । তবে কিছুটা সুখবর হচ্ছে- গ্রামীণ মেলার কনসেপ্টকে ধারণ করে এখন অনেক আধুনিক জিনিসপত্রেরও মেলা বসে । বিভিন্ন মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরণের আয়োজন হয় শহরাঞ্চলে । যেমন : মোবাইল মেলা, কম্পিউটার মেলা, আইটি মেলা, আবাসন মেলা । আবার সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাতে বিজ্ঞান মেলা, বাণিজ্যমেলা, শিল্পমেলা, বইমেলা, কৃষি মেলা, স্বাধীনতা মেলা প্রভৃতি নামের কিছু মেলার আয়োজন করা হয় । এবারই প্রথম বারের মতো ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো পয’টন মেলা । আয়োজন যারাই করুক আর যেভাবেই হোক, মেলা যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে আসছে । নানা ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের মধ্যে রচনা করছে সেতুবন্ধন । তাই মেলা বেঁচে থাকুক এবং মেলার হাত ধরে পয'টন বিকশিত হোক চিরদিন ।

গ্রামীণ মেলা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ ৷ বিভিন্ন পালা-পার্বণকে কেন্দ্র করে বছর জুড়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এই মেলার আয়োজন করা হয় ৷ এমন কয়েকটি মেলার নাম নিম্নরুপঃ

বৈশাখী মেলাঃ
এটি মূলত সার্বজনীন লোকজ মেলা ৷ ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা নতুন বছরের শুরুতে বাংলাদেশের সর্বত্রই আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার ৷ নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে এ বৈশাখী মেলা ৷ স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলার মূল আকর্ষণ ৷ কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের বৈশাখী মেলা অন্যতম ।

লোক ও কারুশিল্প মেলাঃ
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে প্রতি বছর মাসব্যাপী বসে লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব ৷ সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে প্রতি বছর এ মেলা শুরু হয় জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি ৷ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এ লোকজ মেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকার সব রকম লোকজ সংস্কৃতি ও কুটির শিল্প সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হন শিল্পীরা ৷

বটতলায় বৌমেলাঃ
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে চারশ’ বছরের পুরানো একটি বট গাছকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে পালিত হচ্ছে বউ মেলা৷ বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় দিনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা পরিবারের সুখ শান্তি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে এখানকার বট গাছকে পূজা করেন৷ এ উপলক্ষে পাঁচদিনের মেলাও বসে বট গাছের চারপাশে৷

লাঙ্গলবন্দের মেলাঃ
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দের ব্রহ্মপুত্র নদে সনাতন ধর্মাবলমম্বীরা চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী বা অশোকাষ্টমী তিথিতে পুণ্যস্নানের জন্য সমবেত হন ৷ এ উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী মেলা বসে ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরে ৷

লালন মেলাঃ
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামে মরমী শিল্পী লালন সাঁইয়ের সামাধিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর দুইবার লালন মেলা অনুষ্ঠিত হয়৷ তার একটি হচ্ছে লালন সাঁইজির তিরোধান তিথি উপলক্ষে এবং অন্যটি দোলপূর্ণিমায় লালন প্রবর্তিত সাধুসঙ্গ উপলক্ষে ৷

রাস মেলাঃ
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবনের দুবলার চরে প্রতি বছর কার্তিক-অগ্রহায়ণের পূর্ণিমা তিথিতে বসে রাসমেলা ৷ অনেক হিন্দু পুণ্যার্থী আর পর্যটক এ উৎসবে শামিল হতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসেন ৷ এ উপলক্ষে পাঁচ দিনের একটি মেলাও মেলা বসে দুবলার চরে৷ ১৯২৩ইং সাল থেকে মেলাটি চলে আসছে ৷

রাশ লীলার মেলাঃ
মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা কমলগঞ্জ আর আদমপুরে কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব রাস লীলা ৷ এ উপলক্ষে তিন দিনের মেলা বসে কমলগঞ্জের মাধবপুর ও আদমপুরের সনাঠাকুর মণ্ডপ এলাকায় ৷

গুড়পুকুরের মেলাঃ
বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এ মেলাটি ৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো ৷ বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ভাদ্র মাসের শেষে অনুষ্ঠিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয় ৷ চলে এক মাসব্যাপি ৷

পোড়াদহের মেলাঃ
গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের গোলাবাড়ি এলাকায় ইছামতি নদীর তীরে আড়াইশ বছর ধরে বসে ব্যতিক্রমী এক মেলা ৷ প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবার বসে দুই দিনের এ মেলা ৷ এ মেলার মূল আকর্ষণ বড় বড় আকৃতির নানা রকম মাছ ৷

মধু মেলাঃ
যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে প্রতি বছর বসে সপ্তাহব্যাপী মধু মেলা ৷ বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে হয় এ মেলার আয়োজন করা হয় ৷

রথের মেলাঃ
সাধারণত বাংলা বছরের আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রথের মেলা বসে ৷ সবচেয়ে বড় রথের মেলা বসে সাভারের ধামরাইয়ে ৷ এছাড়া কুষ্টিয়ার রথখোলার মেলা, রাজশাহীর পুঠিয়ার রথের মেলা, সিলেটের লামাপাড়া রথযাত্রার মেলা উল্লেখযোগ্য ৷

আরো কিছু বিশেষ মেলাঃ
চট্টগ্রামে জব্বারের বলী খেলা উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপি একটি মেলা বসে লালদীঘির পাড়ে । মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী খাসিয়া, মণিপুরি, সাঁওতাল, টিপরা ও গারো সম্প্রদায়ের বাস । প্রতি বছরে চা বাগানগুলোয় ‘ফাগুয়া উৎসব’, টিপরাদের ‘বৈসু উৎসব’ মণিপুরিদের ‘রাস উৎসব’ ও গারোদের ‘ওয়ানগালা উৎসব’ উৎযাপিত হয় জাঁকজমকভাবে । এই সময় এই অঞ্চলগুলোতে বিশেষ মিলন মেলা বসে । তাঁদের এ আনন্দ-উৎসবে অতিথি হয়ে মিশে যেতে পারেন আপনিও । সকলকে ধন্যবাদ ।

তথ্যঃ গুগল এর সহায়তায় এবং দৈনিক পত্রিকার সৌজন্যে প্রাপ্ত এবং সংকোলিত ।

0 comments

Leave a comment

Login To Comment