Image

Incredible Bhutan – World’s Only Carbon-Negative Country

আমি এক্সট্রিম ট্রাভেলার নয় যদিও, কিন্তু ঘুরতে যে আমার খুব ভাল লাগে সেটি ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিলাম, ভাললাগার অন্যতম কারণ ছিল ঘুরতে গেলে পড়া লাগেনা, স্কুলে ফাঁকি দেওয়া যায় ।

যখন থেকে বাসা থেকে একা এদিক সেদিক যাওয়ার ব্যাপারে বাধা দেওয়া বন্ধ করে দিল, এরপর থেকেই দেশের এদিক সেদিক ঘুরেছি, ঘুরছি ।

ফটোগ্রাফী করার সুবাদে যেন আমার পাখা গজালো, ঘুরাঘুরির পরিমাণ বেড়ে গেল ।

কিন্তু সেসব একদমই টুরিস্টের মত, মোটামুটি সেখানেই যেতাম, সেখানের প্রধান এলাকাগুলোই ঘুরে আসতাম বেশীর ভাগ, বেশী গভীরে যাওয়া হতোনা ।

আমার এত বেশী ঘুরাঘুরির পরিমাণ দেখে অনেকের ধারণা আমি অনেএএএএএক যায়গা ঘুরেছি, হ্যাঁ তাদের তুলনায় অনেক হতে পারে, কিন্তু অনেকের তুলনায় আমার কিছুই ঘুরা হয়নি,চট্টগ্রামের হয়েও আমি এখন পর্যন্ত বান্দরবানের গভীরে যায়নি,ঘরের দূয়ারের সীতাকুন্ড-মীরাসরাই এর কোন ঝর্ণায় আমার চরণ পড়েনি ।

দেশের দেশীয় সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিদেশী অনেক সুন্দরের প্রতি আমার দূর্বলতা আজীবনের, স্বপ্ন দেখি সেসব পদার্পণের , তার মধ্যে অন্যতম ছিল ভূটান ।

এই দেশটি আমার কাছে অধরা মনে হতো, মনে হতো অরাধ্য । অনেককে যেতে দেখতাম, কিন্তু নিজে যাবো সেটি ভাবতে পারতাম না কেন জানি ।

পরে কাছের অনেককে যেতে দেখে মনে আপনা-আপনি সাহস জমা হতে শুরু করলো ।তাদের মধ্যে অন্যতম হলো রাহুল, কলেজ জীবন থেকে আমরা বন্ধু ।

আমার সিকিম যাত্রায়ও অনেক ভাবেই তার সহযোগীতা পেয়েছি আমি ।

সিকিম থেকে ফিরে আমি তাকে বলে রেখেছিলাম অদূর ভবিষ্যতে কখনো ভূটান যাওয়া হলে যেন আমাকে নিয়ে যায় । বেশীদিন অপেক্ষা করতে হলোনা । রাহুল জানালো খুব শীঘ্রই যাওয়া হবে, যেন প্রস্তুতি নেওয়া আরম্ভ করি । তারপর কি আর অপেক্ষা কাটে? রমজানের ঈদের একদিন পর যাত্রা । ঈদে পরিবারের সাথে এবার বেশী সময় কাটানো হবেনা ভেবে মন একটু খারাপ হলেও স্বপ্নের দেশেই ঈদ ভ্রমণ হবে ভেবে কষ্ট উবে গেল নিমিষেই । ঈদের একদিন পর সকালে ঢাকা রওয়ানা দিলাম, ঢাকা থেকে ওইদিনই রাত ৯টাই বুড়িমারী-চেংরাবান্ধা বর্ডারের বাস । রাহুল আর আমি চট্টগ্রাম থেকে রওয়ানা দিলাম। ১০০ মাইলস ট্যুরস বিডি এর অ্যারেঞ্জ করা এই ট্যুরের বাকি ট্যুরমেটরা ঢাকা থেকে যোগ দিবেন, যদিও পরে জেনেছি চট্টগ্রাম থেকে আমাদের একই বাসে ফোরকান ভাই আর জাবেদ ভাইও ঢাকা গিয়েছেন, আগে পরিচয় না থাকায় চিনতে পারিনি ।

বাস কাউন্টারে আমার একটু দেরী করে পৌঁছানোর বাতিক আছে, চট্টগ্রাম আর ঢাকার দুটো বাস কাউন্টারেই রাহুল আমার আগে পৌঁছে আমার জন্য বাস আটকে রেখেছিল ।

ঢাকা কল্যানপুর থেকে বাস ছাড়লো । বাস আর সিট দেখে নিজের জন্য মায়া হলো। এতদূরের যাত্রা আমার নাদুস নুদুস শরীর এই ভাঙ্গা সিট আর গাড়ির ঝাঁকুনি নিতে পেয়েছিল যদিও । ভোর ঠিক পাঁচটাই বর্ডারে পৌঁছালাম । ইমিগ্রেশন শুরু হবে ৯টার পর । ঈদের কারণে প্রচুর পর্যটক ছিল , ধরেই নিলাম ইমিগ্রেশনে আজকে সময় লাগবে অনেক । কিন্তু টাকা দানের সঠিক ফাঁকফোকর না চেনার কারণে যে বাংলাদেশ বর্ডারের ইমিগ্রেশন সেই সময়টাকে ৮ ঘন্টারও বেশীতে উপনীত করবে, আগের রাতে বাসের ঘুমের স্বপ্নেও ভাবিনি । অতএব বিকেল চারটার দিলে আমরা বাংলাদেশ বর্ডার পার হলাম । ভারত ইমিগ্রেশনে বড়জোর ২ ঘন্টা লেগেছে আমাদের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে । এত সময়ও লাগতো না যদি ঈদের ভীড় না থাকতো । মোটামুটি গরমে আমরা ইমিগ্রশেন লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম । ভারত ইমিগ্রেশনের কিছু কর্মী নিরলসভাবে শরবত বানিয়ে খাওয়াচ্ছিল সবাইকে । অথচ একটু আগে আমাদের জাতি ভাইরা আমাদের কাছ থেকে তিনগুন বেশী টাকা আদায় করে, ৮ ঘন্টা আমাদের রোদে পুড়িয়ে তারপর বর্ডার পারের অনুমতি দিয়েছিল ।

আগে থেকে আমাদের ট্যুর ওর্গানাইজার ম্যাথিও-এর রিজার্ভ করা ২০ সিটের ভূটানি বাস আমাদের জন্য সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিল । দীর্ঘ ৮-১০ ঘন্টার হয়রানির পর আমরা মোটামুটি সবাই আধ মরা অবস্থায় ছিলাম, ম্যাথিও এর ভূটানি পার্টনার সুন্দর চেহারার ল্যুম্থাং আর সুঠাম দেহের অধিকারী ভূটানি ড্রাইভারকে দেখে আমাদের মাঝের উদ্দীপনা কিছুটা ফিরে এলো, মনে হলো অর্ধেক ভূটান দেখা হয়ে গেল আমাদের ।

পশ্চিমবঙ্গের প্রশস্থ  রাস্তা ধরে আমাদের বাস ছুটে চললো, গন্তব্য ভারত-ভূটান বর্ডার শহর জয়গাও । দুপাশে বিস্তর্ণ সবুজ জমিন, কাশবন এবং তারও পরে সম্ভবত দেখতে পাচ্ছিলাম ভূটানের পাহাড় চুড়া, আবছা ভাবে ।  যতই আমরা জয়গাও এর কাছাকাছি হচ্ছিলাম, পাহাড়গুলো দূরে সরতে সরতে হারিয়ে যাচ্ছিল, সম্ভবত পরদিন খুব কাছ থেকে ধরা দিবে বলেই । আমাদের পরিকল্পনায় ছিল সেদিনই ভূটান প্রবেশ করে তার শহর পারোতে পৌঁছানার । কিন্তু বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের এমন কান্ডের পর সেদিনের মতো আমাদের জন্য ভূটান গেইট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । মোটামুটি রাত আটটার আশপাশ সময়ে আমরা জয়গাও পৌঁছায় । সেদিন ভূটান প্রবেশ করতে পারবোনা যেনে ম্যাথিও আমাদের জন্য ল্যুম্থাং-এর মাধ্যমে স্বল্প নোটিশেও জয়গাওতে সুন্দর আর গোছানো একটি হোটেল ব্যবস্থা করে, হোটেল কস্তুরী ।  রাতটা এখানে কাটিয়েই সকালে ভূটান প্রবেশ করবো আমরা, বজ্র ড্রাগনের দেশে, স্বপ্নরাজ্যে । রুমে কস্তুরীতে ব্যাগ-পাটেরা রেখে বের হলাম রাতের খাবারের খুঁজে । এখানে রাত নয়টায় সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, সম্ভবত তার কারণ অতি মুনাফার লোভে গভীর রাত অবধি ব্যবসা করা থেকেও পরিবারকে বেশী সময় দেওয়ার স্পৃহা । এবং পরে এক দোকানদারের কাছে সে কথার প্রমাণও পেয়েছিলাম । ট্যুরমেটদের সাথে তেমন পরিচয় কিংবা সখ্যতা  গড়ে উঠেনি তখনো । গ্রুপে রাহুলের স্কুলের বন্ধু তারেকের সাথে পরিচয় হয় বর্ডারে । পরবর্তীতে তারেক সহ ইমাম, শাহীন আর নিপু, আমরা হয়ে উঠি ভাল বন্ধু ।পরদিন সকালে উঠেই ভারত ইমিগ্রেশন অফিস থেকে ডিপার্চার সিল নিয়ে ভূটানের গেইট পার হয়েই বর্ডার শহর ফুন্টসলিং এর ভূটান ইমিগ্রেশন অফিস থেকে ভূটান ভ্রমণের অনুমতি কিংবা ভিসা নিয়ে আবার ভারতের জয়গাও ফিরে আসি 😀 । গতরাতে ট্যুরমেট কয়জনের শুনা অদ্ভুত এক বৃদ্ধের হোটেলে সকালের নাস্তা করতে যায় । এই অদ্ভুত বলছি এই বৃদ্ধকে? তার হোটেলে পাওয়া যায় রুটি আর সাথে খাওয়ার জন্য দুই/তিন রকমের তরকারী । আপনি যদি রুটি অর্ডার করেন, সাথে তরকারীর প্রতিটি আইটেম আসে রুটির সাথে কমপ্লিমেন্টারী, ভাবুন তো রুটির দাম কত? মাত্র পাঁচ রুপি ।

সকালের খাওয়ার পর্ব সেরে আমরা হোটেল রুমে ফিরে এসে ব্যাগ পত্র নিয়ে বের হলাম, নিচেই আমাদের বাস অপেক্ষায় ছিল, এবার বাস আর ড্রাইভার পরিবর্তন হলো, ড্রাইভার হিসাবে আমাদের সাথে যোগ দিলো আরুন, এখন থেকে সে-ই সামনের সাত-আট দিন আমাদের সাথে থাকবে, নিয়ে যাবে শহর থেকে শহরে, ভ্যালী থেকে পাহাড়ে ।

মোটামুটি বেশ বেলা করেই আমরা রওয়ানা দিলাম, পাহাডের পথ আঁকাবাঁকা হয় সেসব আপনারা যানেন, সেসব পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলাম আমরা, রাস্তা কখনো নিচু আর কখনো খাঁড়া । ৩/৪ ঘন্টা পর পথে যাত্রা বিরতি হলো, থামলাম ঢাকা চট্টগ্রাম রুটের বিরতিস্থান কুমিল্লা টাইপ স্থানের একটি রেস্টুরেন্টে। কাজ কুমিল্লা টাইপ হলেও দৃশ্য মোটেই কুমিল্লার নয়, রেস্টুরেন্টি বানানো হয়েছে পাহাড়ের একদম কিনারায়, আর আশ-পাশের ভিউ মাশা আল্লাহ, আমরা রেস্টুরেন্টের আশ-পাশের এলাকায় ততক্ষণ ছবি তুললাম যতক্ষণ না আরুন বললো বিরতি শেষ আর আমাদের যতক্ষণ না মনে হলো এখনি ছবি তোলা না থামালে সামনের ৬-৭ দিন ফোন-ক্যামেরার স্পেস সংকটে পড়বো ।  তবে আসার দিনও আমরা এই রেস্টুরেন্টে থামলাম ঠিকই, কিন্তু ছবি কেউ তুলিনি। ভাবছেন ভূটানের ছবি তুলতে তুলতে স্পেস শেষ? ভূল ভাবছেন মশাই, প্রথমদিন এই এলাকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দম বন্ধ করে ছবি তুললেও ভুটান ঘুরে এসে আমাদের কাছে এই রেস্টুরেন্ট শ্রেফ কুমিল্লায় মনে হয়েছে ।

যাক, দুপরেরও অনেক পড়ে আমার পাহাড়ের রানী ভুটানের শহর পারোতে পৌঁছালাম । লাঞ্চ করতে বসে গেলাম একটি রেস্টুরেন্টে, আগে থেকেই ভুটানের খাওয়া নিয়ে আমাদের টেনশন থাকাতে আমরা পারোতে লাঞ্চ টাইমে অপরিচিত নামের কোন মেন্যু অর্ডার করলাম না, যেসব মেন্যুর আগে পরে পরিচিত শব্দ ছিল, সেসব দিয়ে লাঞ্চ সারলাম । পরবর্তী কয়েকদিনের খেয়াল করলাম ভূটানের বেশীরভাগ খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত আর ছেলেদের দেখলাম ভ্রমণ সম্পর্কিত পেশায় কিংবা ড্রাইভিং-এ ।

পারো ঃ

পারো ভূটানের প্রথম সারির শহর, তার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হলো পারো এয়ারপোর্ট, চেলালা পাস এবং বিখ্যাত টাইগার নেস্ট । পৃথিবীর ভয়ংকর কয়েকটি এয়ারপোর্টের মধ্যে পারো এয়ারপোর্ট অন্যতম । পারো শহরে আমরা গতকাল পৌঁছে রাত্রিযাপন করে আজ সকালে টাইগার নেস্ট ট্রেক করার কথা ছিল, কেন তা সম্ভব হয়নি তা ইতিমধ্যেই জেনেছেন আপনারা । আর আজকেও আমরা থাকছিনা পারো । শেষের দিকে একদিন থাকবো এখানে । লেট লাঞ্চ সেরে আমরা পারোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী আর শহরটা একটু ঘুরে দেখে রওয়ানা দিলাম । গন্তব্য এবার হা ভ্যালী । পথে উঁচু রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে পারো এয়ারপোর্ট দেখে নিলাম, সন্ধ্যা হয়ে গেলে এই এয়ারপোর্টে আর ফ্লাইট উঠানামা করে না, তাই ভয়ংকর এই এয়ারপোর্টের বিমান উঠানামা দেখা মিস হলো আমাদের । পথেই রাত নামলে রাতের চেলালা পাস দেখতে থামলাম আমরা, বাস থেকে বের হতেই হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস শীতের রাতে ফিরিয়ে নিলো আমাদের, কাঁথা না থাকায় জ্যাকেট মুডি দিয়ে আবার বাসে উঠে গেলাম । রাত ৭-৮টাই পৌঁছালাম হা ভ্যালী ।

হা ভ্যালী ঃ

আগে থেকে বুকড রিসোর্টে থামলো বাস, বাস থেকে নামার আগেই অনেকগুলো মেয়ে কন্ঠের কলকাকলী শুনতে পেলাম । নেমেই দেখে ৬-৭টা মেয়ে আমাদের ল্যাগেজ নিয়ে টানা- হ্যাচড়া করছে, ভয় পেলেও সাহস না হারিয়ে সামনে গেলাম, জানতে পারলাম তারা সবাই এই রিসোর্টের স্টাফ । এবং এসব মেয়েরা মিলেই পুরো রিসোর্ট আর রেস্টুরেন্ট সামলায় । ট্যুরমেট ইমাম মজার ছলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো বাংলাদেশের ফিল্ম অভিনেতা বলে, কি আর? পরদিন রিসোর্ট না ছাড়া পর্যন্ত আমি তাদের কৌতূহল, মজার নেওয়ার পাত্র হিসাবে ছিলাম আর কি ! ভূটানের মানুষ অতিথিপরায়ন আর বন্ধুসূলভ হওয়াতে তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে বেশ কাটলো সময় ।হোটেলের দ্বিতীয় তলার বারান্দা থেকে দূরের হা ভ্যালীর শহরের তারার মত অসংখ্য বাতি দেখা ছাড়া রাতে আর হা ভ্যালীর সৌন্দর্য উপভোগ না গেলেও রাতটা কেটেছে জম্পেস । সারাদিনের জার্নিতে একটু কাহিল আমি সবার আগেই ঘুমিয়ে পড়লাম । মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গলো উচ্চস্বরের গানের শব্দে । আমাদের অর্গানাইজার ম্যাথুউ-এর সর্বক্ষণের সঙ্গী উকুলেলে বাজিয়ে এই বরফ জমা ঠাণ্ডার মাঝেও এতমধ্যেই আসর গরম করে ফেলেছে সে । যোগ দিলাম আসরে । অনেকক্ষণ ম্যাথিউর সাথে গলা মিলিয়ে গান করে ভোর রাতে ঘুমিয়ে পড়ে মোটামুটি ভোরে উঠলাম সবাই । সকালে হা ভ্যালী আর আমাদের রিসোর্টের সৌন্দর্য দেখে হা হয়ে যাওয়া মুখে গপাগপ গুঁজে দিলাম সকালের নাস্তা ।হা ভ্যালী শহর থেকে অনেক উপরে বড় কয়েকটা পাহাড়ের নিচে আমাদের এই রিসোর্ট । রিসোর্টের বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা মিলে পুরো শহরের, ওই যে দূরে, অনেক নিচে ।

সবাই বের হলাম হা ভ্যালী ঘুরে দেখতে, নিচের পাথুরে নদীটির পাড় ধরে হেঁটে গেলাম আর্মী ক্যাম্পের গলফ মাঠে, এই মাঠ যেন সুউচ্চ পাহাড় থেকে বয়ে নামা এক সবুজ গালিচা ।  অনেকক্ষণ এখানে ঘুরে আমরা বাসে চড়ে দেখতে গেলাম হা ভ্যালীর পাশে হোয়াইট টেম্পল জং বা মনস্ট্রিতে-এ, মনস্ট্রি বা জং হলো ভূটানীজদের প্রার্থণার স্থান বা মন্দির বলতে পারেন, ভূটানের বাড়ি-ঘরের মতই এই জং গুলোর নির্মানশৈলী সত্যিই অপুর্ব । দুপর নাগাদ জং ঘুরে আমরা রিসোর্টে ফিরে এলাম, সেই ৬-৭ জন অপুর্ব মেয়েদের অতিথেয়তায় সেরে নিলাম লাঞ্চ। এবার হা ভ্যালী ছেড়ে যাওয়ার পালা, সত্যিই এই সুন্দর রিসোর্টটাকে মিস করবো । পথে আমরা কাল রাতের আধেক দেখে রেখে যাওয়া চেলেলা পাসে থামলাম, রাতের মত এত ঠাণ্ডা না হলেও ঠাণ্ডা ঠিকই কাবু করলো আমাদের । এই চেলালা পাসের উপর দিয়ে পাহাড় কেটে যাওয়া রাস্তা ভুটানের সর্বোচ্চ রাস্তা হিসাবে স্বীকৃত । কোন জায়গায় ছবি তোলা মিস না করার রেকর্ড গড়তে এখানেও প্রচুর ছবি তুললাম আমরা । বাকি দিনের জন্য ক্যামেরায় স্পেস রেখে এইদিনের মত ক্ষান্ত দিয়ে বাসে উঠে পড়লাম, যাত্রা এবার ভূটানের রাজধানী থিম্পুর উদ্দেশ্যে । পাহাড়ের রাস্তা আঁকাবাঁকা,সে কথা বারবার বলে বিরক্ত না করতে চাইলেও আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়েই আমরা রাতের প্রথম প্রহরে থিম্পু পৌছালাম ।

থিম্পু ঃ

যথারীতি আগের বুকড করা রিসোর্টে পৌঁছেই তো আমরা থ, এটি কোন রিসোর্ট নয়, পাহাড়ের উপর কোন শিল্পীর নিজের জীবনের সব শিল্পসত্ত্বা ঢেলে দিয়ে বানানো একটি স্বপ্ন মহল যেন এটি । কাঠ আর কংক্রিটের মিশেলে তেরী ডুপ্লেক্স একটি বাংলো। সুন্দরী গাকি এবং তার পরিবারের এই শিল্পে তারা থাকার পাশাপাশি পেইং গেস্ট হিসাবে আমাদের রাত্রি যাপনের জায়গা হয়েছে এখানে । এই বাংলোর সামনের দিকের প্রতিটি প্যানারোমা জানালা দিয়ে উপভোগ করা যায় অনেক নিচের থিম্পু শহরের রাতের রুপ । তবুও এত দূর থেকে থিম্পু দেখে মন না ভরাতে সিদ্ধান্ত হলো ডিনারের পরে আমরা শহরে যাবো । শহর বাংলোর ঠিক নিচে মনে হলেও পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে গাড়ী করে শহরে আমরা ৩০ মিনিটের আগে পৌঁছাতে পারলমনা । এর কারণ ভুটানের রাস্তাগুলো বড় বড় পাহাড়গুলোতে ৩৬০ ডিগ্রিতে কেটে কেটে বানানো, যার কারণে গাড়িগুলোর একটি পাহাড় পার হতেই লেগে যায় অনেক সময় । আমাদের রাতে বের হওয়ার উদ্দেশ্য হলো রাতের থিম্পু দেখা আর নাইট ক্লাবে উঁকি দেওয়া, শহরে গিয়ে জানতে পারলাম সেদিন ক্লাব সাপ্তাহিক বন্ধের দিন । কক্সবাজারের প্ল্যান করে শেষে যেতে না পেয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র ভ্রমণ টাইপ একটি ক্লাবে গেলাম আমরা । ভ্রমণ সঙ্গী ইমামের মতে, সে রাতে আমরা কিছু স্কুল বাচ্চাদের নাচ দেখে অতঃপর বাংলোতে ফিরলাম, ফিরেই জমে উঠলো ম্যাথুউর আয়োজনে গানের আসর-সেকেণ্ড এপিসোড । মাঝ রাত অবধি গানে গলা মেলাতে মেলাতে সবাই ভূলে গেলাম কক্সবাজারের জায়গায় পতেঙ্গা দেখার দুঃখ । ঘুমাতে গেলাম। সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে আরুণ আর তার বাস নিয়ে বের হলাম শহর আর সাইড সীয়িং-এ ।প্রথমেই গেলাম থিম্পুর বিখ্যাত লোকাল মার্কেট এরিয়ার, এখানে মিলে ভূটানের বিখ্যাত যতসব হস্তশিল্প এবং বিখ্যাত সব স্থানের প্রতিকৃতি । পর্যটকদের ভুটান সম্পর্কিত কেনাকাটার প্রধান মার্কেট এটি । কেনা কাটা শেষ হতেই একটু দূরের একটি মনস্ট্রিতে গেলাম আমরা, এই মনস্ট্রির পাশের এক চাচার দোকানের সিঙ্গারা বেশী মুগ্ধ করেছিল আমায়, মাত্র ১০ রুপীতে এত বড় আর এত মজাদার সিঙ্গারার খুঁজ দেওয়ার জন্য অন্তর থেকে ধন্যবাদ সানী ভাই, মাজেদ ভাই আর নাসের ভাইকে । সিঙ্গারা আর মনস্ট্রি পর্ব শেষ করে আমরা যাত্রা অব্যাহত রাখলাম থিম্পুর আরো বিখ্যাত বুদ্ধা টেম্পলের দিকে । ভূটানের বিখ্যাত সব কিছুই মোটামুটি পাহাড়ের উপর (যেহেতু দেশটাই পাহাড়ের উপর :p ), তেমনি এই বুদ্ধা টেম্পলও এর ব্যতিক্রম নয়, এই টেম্পল এরিয়া এবং এর আশপাশে সদ্য বৃষ্টিস্নাত নিম্ন এরিয়াগুলো দেখতে অপুর্ব লাগছিল, মেঘগুলো ‘যেন’ আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল নয়, মেঘগুলো আসলেই আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল একটু পরপর । এই টেম্পলের নিচেই এই ট্যুরের সর্বপ্রথমবারের মতো হিমালয় কন্যা দেশগুলোর বিখ্যাত খাওয়ার মম চেখে দেখেন অনেকে এবং এর পরপরই আমরা যারা খাইনি তাদের ভাগ্যবান হিসাবে আখ্যায়িত করেন :p। টেম্পলে মেঘবিলাস আর মম পর্ব ফুরিয়ে গেলে আমরা রওয়ানা দিলাম, যাত্রা অনেকদূরের ফোব্জিকা ভ্যালী, এই ট্যুরের সবচে আকর্ষনীয় স্থান । পথে পুনাখা শহরে থামলাম লাঞ্চের জন্য ।পরদিন ফোব্জিকা থেকে ফিরে পুনাখাতে আমাদের একদিন থাকা হবে । ফোব্জিকাতে আমরা কোন রিসোর্ট কিংবা বাংলোতে থাকার সুযোগ পাবোনা, থাকবো এক স্থানীয় কৃষক পরিবারের ঘরে,তাদের ফার্মহাউজে, তাদের হাতেই রান্না হবে আমাদের রাতের খাওয়ার । জেনে গেছি আশ-পাশে না পাবো কোন দোকানপাট, সুতরাং আমরা পুনাখাতে লাঞ্চ সেরে রাত আর পরদিন সকালে খাওয়ার জন্য কিছু শুকনো খাওয়ার কিনে রওয়ানা দিলাম ফোব্জিকায়

ফোবজিকা ঃ

যথারীতি গিয়ে পৌঁছালাম রাতে, আশ-পাশ দেখার সুযোগ হলোনা সেদিনও, তাদের ফার্মহাউজটি দোতলা,নিচতলা এখনো থাকার উপযোগী হয়নি, সুতরাং আমাদের থাকার যায়গা হলো দোতলায়, ঘরের ভেতরের কন্ডিশন অনেকটা আমাদের মতই,কাঠের সিড়ি বিয়ে দোতলায় উঠতেই প্রথমে একটি খোলা বারান্দা  এবং সেটি পার হতেই একটি ড্রয়ং রুম এবং সেটিকে ঘিরে ৪-৫টা শোবার ঘর, ড্রয়ং রুমে ঢুকতেই মাঝখান বরাবর চোখে পড়লো উঁচু বড়সড়ো একটি চুলা এবং তার উপর বড় পাতিলে সেদ্ধ হচ্ছে চা ।বাড়ির মানুষ বলতে ২ জন মহিলা আর একজন পুরুষ, মহিলা দুজন পরস্পর বোন । আমরা চুলা গিয়ে বসতেই তাদের একজন অনেক অনেকগুলো মগ আর বয়াম ভর্তি বিস্কুট এগিয়ে দিলো, এদের আতিথেয়তার ধরণে বুঝলাম, আগ বাড়িয়ে পুনাখা থেকে কিনে আনা আমাদের ড্রাই ফুড আমাদের ব্যাগের কোনাতেই পড়ে রবে, হলোও তাই । আমি চাইছিনা ফার্মহাউজ আর এর রুমগুলো নিয়ে বলতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত লেখাটাকে রচণামূলকের পর্যায়ে নিয়ে যেতে, কিন্তু এত রিমোট একটি এরিয়াতে এমন ঘর আর এর বিছানাগুলো আমাদের কল্পনারও বাহিরে ছিল । বলে রাখি রিমোট এরিয়া বলেই এসব স্থানে লোকাল গাড়ী খুব একটি মিলেনা, কিন্তু প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারেরই নিজেদের ছোট ছোট কার আছে এবং মহিলারাও পটু ড্রাইভিং-এ ।আছে এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক আর ৮০ শতাংশ এলাকায় ফোরজি সেবা ।

ভুটানের অন্য সব জায়গাতে আমরা অল্পসল্প জানা ইংরেজি আর হিন্দি মিলিয়ে কথোপকথনে পার পেয়ে গেলেও ধরাটা খেলাম এখানে এসে ।

এই ঘরের মালিক-মালকিনরা না জানে ইংরেজি, না হিন্দি । আমাদের গাইড কাম ড্রাইভার আরুন তার দক্ষ হাতে গাড়ী সামলানোর মত করে এখানেও আমাদের সামলে নিলো, দোভাষীর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে । ঘণ ডাল, সাদা ভাত, কম ঝালের কিন্তু অনেক বড় এক ধরণের মরিচ ভাজা এবং মিক্সড একটি সবজি দিয়ে সারলাম স্মরণকালের শ্রেষ্ট একটি রাতের খাবার, এই কারণ অসাধারণ তাদের রন্ধনশৈলী । এদের খাওয়ারের একটু বেশী দামের কারণে আগে থেকেই প্ল্যান ছিল পরদিন দুপরের এখানে না খাওয়ার। আর অনেকে রান্না কেমন না কেমন হবে ভেবে রাতে খায়নি রাতে, অতঃপর রাতে খাওয়া না খাওয়া দুই পক্ষই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, যত দামই হোক, পরদিন সকালে ফোব্জিকা সাইড সীয়িং করে দুপরে আমরা এখানেই খাবো । সবশেষে মাঝ রাতে সবার অংশগ্রহণে, ম্যাথুউ-এর সঞ্চালনায় শুরু হলো সংগীত পর্ব, এপিসোড ৩ এর আসর। সবচে বেশী মজা করে গান গেয়েছিলাম আমরা সেদিন । আর সব শেষেরও শেষে ঘুমাতে গেলাম, সকালে উঠে চক্ষু চড়কগাছ, না কিছু খোয়া যায়নি, শুধু দৃষ্টি ছাড়া ।

আগের প্রতিটি থাকার যায়গা পাহাড়ের উপরে হলেও এই বাংলো অনেকটা সমতলে,পাহাড় বেয়ে নেমে আসা একটি ভ্যালীর মাঝখানে আর তার চারদিকে ক্ষেত, আলুর ক্ষেত ।সবুজের সমারোহের মাঝখানে একটি বাড়ি, উফ সে যে কি ছোট জুড়ানী  । বিছানা থেকে চোখ মেলতেই চোখ গিয়ে আটকাচ্ছে দূরের ক্ষেত, তার পরের ভ্যালী অথবা তারও পরের পাহাড়ে । ঘরের ভেতর বেশীক্ষণ নিজেদের আটকে রাখা গেলনা, বের হয়ে পড়লাম, সারি সারি পাইন গাছে ভরা পাহাড়ের মাঝের পথ পাড়ি দিয়ে আমরা উপত্যকা/ভ্যালীর রাস্তায় গিয়ে পড়লাম, আরো অনেকদূর এই উপত্যকার মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলাম আমরা । এতদূরের পাহাড়েও ঘণ ঘণ পাইন গাছের বাগান এবং তাদের বেড়ে উঠার প্রয়াস দেখে অনুভব করলাম কেন ভূটান একটি কার্বন নেগেটিভ দেশ । কাশ্মীর কিংবা সুইজারল্যান্ড না যাওয়া আমি ফোব্জিকা ভ্যালীকে তাদের সাথে তুলনায় দাঁড় করালাম, ভ্যালীতে দেখা ঘোড়াগুলোও আমার তুলনার মাত্রা বাড়িয়ে দিলো যেন। বিস্তির্ণ সবুজ ভ্যালীতে আমরা দুপর পর্যন্ত দুরন্তপনায় মেতে উঠেছিলাম ।ভ্যালীর উত্তর থেকে-দক্ষিন, পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত দৌড়ে, হেঁটে আর কাঁদা মাড়িয়ে ছবি তোলায় মত্ত হয়ে রইলাম আমি । আর ভ্যালীতে আমার থেকেও যদি বেশী কেউ হেঁটে থাকেন, তিনি শারীরের যত্নে অতীব সতর্ক ফুরকান ভাই, বডি বিল্ডার এই ভাই এমন খোলা যায়গা পেয়ে আচ্ছামত জগিং সেরে নিয়েছেন । এমন সৌন্দর্যতে বিমোহিত হয়ে আমরা যেন ফিরতেই চাইছিলাম না, ফিরতামও না, যদি আরুন গাড়ী নিয়ে গিয়ে আমাদের নিয়ে না আসতো, আর এই লিখা লিখার জন্যও ফিরে আসাটা দরকার ছিল, না হয় আপনারা জানতেন কি করে? ফার্ম হাউজের ফিরে আবার সেই অমৃত দিয়ে লাঞ্চ সারলাম, শেষে বড় পাতিল থেকে ঢেলে একমগ চা, তাদের বিদায় দিয়ে ফিরে চললাম । পথে ফোবজিকার খুব কাছে একটি মনস্ট্রি দেখতে গেলাম, অধিকাংশই কাঠের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই  মনস্ট্রির বয়স কম করে হলেও হাজার খানেক হবে, হাজার বছর আগেও এখানকার মানুষ কতখানী শৈল্পিক ছিল, এর নির্মাণশেলী দেখে ধারণা করা যায় । কিছু সময় পর এবার ফেরার পালা, উদ্দেশ্য এবার পুনাখা ।

পুনাখা ঃ

সন্ধ্যা হয় হয় সময়ে পুনাখা পৌঁছালাম । এবারের হোটেলটি একেবারেই প্রধান সড়কের পাশে, হোটেলের পিছনে কিছুটা দূর দিয়ে বহমান আছে একটি নদী। আগে থেকে আমাদের জন্য অন্য হোটেল বুকড করা ছিল, যার কন্ডিশন নাকি অতটা ভাল ছিলনা বিধায় মাথ্যুউ শর্ট নোটিশে সে হোটেল বদলে আমাদের জন্য এই হোটেল বুকিং দিয়েছে, যাতে করে গত কয়দিনের ভাল পরিবেশে থাকার রেকর্ড না ভাঙ্গে । রিসিপশনে ঢুকেই ভূটানে এই পর্যন্ত দেখা সবচে সুন্দর মেয়েটির দেখা পেলাম, হোটেলের রিসিপশনিস্ট মেয়েটি । হোটেলের সবার বন্ধু সুলভ মনোভাব আর আমার নতুন নতুন মানুষকে জানার স্পৃহায় অল্প সময়ে তাদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে দেখা গেলো আমাকে । ভালই সময় গেল আমাদের বন্ধুত্বের । রাতের খাওয়ার সেরে রাতে যথারীতি আমাদের গানের আসর আরম্ভ হলো, এপিসোড ৪। গান শেষে আমরা রাতের পুনাখার রাস্তায় বের হলাম, এই দেশে সব রাত ৯টাই বন্ধ হয়ে যাওয়াতে রাত একটাই বের হয়ে পুরোই ফাঁকা পেলাম রাস্তাঘাট । পথে দাঁড়িয়ে-হেঁটে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে ফিরে এলাম রুমে । এরপর ঘুমে হারালাম । পরদিন খুব ভোরে উঠলাম না, ১০টার পর করে বের হলাম, গন্তব্য পুনাখার সাইড সীয়িং । প্রথমেই আরুণ আমাদের নিয়ে গেলো বিখ্যাত সাসপেনশন ব্রীজ দর্শনে । এবং ব্রীজ থেকে কম করে হয়ে ৩-৪ কিলো আগে নামিয়ে দিয়ে হাঁটা পথ ধরতে বললো, কারণ ব্রীজের কাছাকাছি গাড়ী যাওয়া বারণ, বাস হওয়ায় তার কারণ । এতদিনে ভালবেসে ফেলা আরুণের বাসের প্রতি এই প্রথম মেজাজ খারাপ হলো আমাদের ।অথচ এটি কার হলে কত সহজেই আমাদের ৩-৪ কিলো হাঁটা পথ, না হেঁটে যাওয়া যেত ।  আসলে ৩-৪ কিলো খুব বেশী পথ না যদিও আমাদের জন্য, কিন্তু এই কয়দিন ভূটানের অন্যান্য শহরে নাতিশীতোষ্ণ কিংবা ঠান্ডা তাপমাত্রায় কাটিয়ে  পুনাখায় হঠাৎই এত গরমের মুখোমুখী হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমরা, পুনাখার তাপমাত্রা ভূটানের অন্যান্য শহরের তুলনায় একটু বাড়তি-ই থাকে । হাঁটার পথ শেষ করে সাসপেনশন ব্রীজ দর্শিত হলো আমাদের, শুধুমাত্র লোহার দুটি রশিতে ঝুলে থাকা এই ব্রীজ খুবই দীর্ঘ, জুড়ে রেখেছে দুটো এলাকাকে । ফেরার পথে পুনাখা জং বা মনস্ট্রির দিকে রওয়ানা হলাম । এই মনস্ট্রির জন্যও বিখ্যাত পুনাখা । এর ভেতরে এতিহাসিক যথেষ্ট নিদর্শন রয়েছে, যা এর টিকেট মুল্য দেখেই অনুমান করা যায় । ৫০০ রুপীর মতো এর টিকেট মূল্য । আমি টিকেট কেটে ভেতরে যায়নি, তবে আমাদের সাথের যারা ভেতরটা দর্শন করে এসেছে, তাদের মুখে এর ভেতরের বর্ণনা শুনে আগামীতে কখনো আসা হলে অবশ্যই ঢুকবো এই পণ করে সেদিনের মত ফিরে এলাম পুনাখায়, লাঞ্চ সেরে পুনাখা ছাড়লাম । যাত্রা এবার পারোর উদ্দেশ্যে । প্রথমদিন থাকতে না পারার শহরে । পুর্ব ঘোষণা অনুযায়ী পথে দোচালা পাসে থামলাম, পথের ঠিক মাঝ বরাবর অপুর্ব সৌন্দর্য্যের একটি স্থান, গোলাকৃতির কিছু স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে এখানে, যুগ কিংবা শতাব্দী ধরে । চেলালা পাসের মত দোচালার অবস্থানও অনেক উপরে হওয়াতে ঠান্ডা ভালই ঝেঁকে ধরেছে আমাদের । উপভোগের মাত্রা কিছুটা কমে আসাতে এবং মেন্ডাটরি ফটোসেশন শেষ হতেই আবার রওয়ানা হলাম আমরা । সন্ধার পরপরই পৌঁছালাম পারো ।

আবার পারো ঃ

হোটেলে চেকইন হলো ।সে রাতে একটু পরেই সবাই বের হয়েছিল, ভূটানে শপিং রাত ছিল সেটি সবার, ভূটানে আমাদের শেষ রাতও ছিল ।আহা কি সব আকর্ষনীয় জিনিস সবাই কিনেছিল, ইমাম ছোট ভাইয়ের জন্যে উকুলেলে থেকে শুরু করে নিপু কিনে নিয়েছল পারোর সমস্ত চকলেট । সেদিন ট্যুরের অন্যতম বেস্ট একটি রাত ছিল। কিন্তু আফসোস, আমি এর কিছুই উপভোগ করতে পারিনি, কারণ পুনাখা থেকে ফিরে অতি বিধ্বস্ত আমি সন্ধ্যা ৭-৮টাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । পরদিন সবাই খুব ভোরে উঠলো, এক্সসাইটেডও সকলে । কারণ ট্যুরের সবচে আকর্ষনীয় অনুচ্ছেদের বাস্তবায়নের প্ল্যান ওইদিন, টাইগার নেস্ট ট্রেক । পারোর এই হোটেলটি পারো শহরের ভেতরেই, গুছানো এবং পরিপাটি । একটু আগে পিছের সময়ে আমরা রেস্টুরেন্টে একত্রিত হলাম, বেশী সময় নষ্ট না হওয়ার জন্য মোটামুটি সহজ খাওয়ার অর্ডার করলাম ব্রেকফাস্টের জন্য । কি এক অদ্ভুত কারণে রেস্টুরেন্ট খুব দেরীতে খাওয়ার পরিবেশন করলো আমাদের, এদিনই মনে হয় প্রথমবারের মত সবাই আমরা একটি কমন ইস্যুতে মেজাজ গরম করেছিলাম । অবশেষে যাত্রা সময়েরও অনেক দেরীতে টাইগার নেস্টের পাদদেশে রওয়ানা হলাম আমরা । মোটামুটি বেলা ১১টাই টাইগার নেস্টের পার্কিং এরিয়ায় বাস থামলো, দেরীতে পৌঁছাতে ড্রাইভার আরুণ আমাদের ফেরার সময় বেধে দিল, জানালো বিকাল ৩ টার মধ্যে নেস্টের পাহাড় ট্রেক করে ফিরে আসতে হবে, কারণ আজই আমরা ফুন্টশলিং/জয়গাও ফিরে যাবো । সমুদ্র পৃষ্ট থেকে নেস্টের উচ্চতা বেশী না, মাত্র ১০,২৪০ ফুট, তার উপর এত উঁচুতে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা। চোখ বন্ধ করে নিজের ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টা করলাম, আবছাভাবে যা দেখলাম, তার সারমর্ম এই, নেস্ট ট্রেক করে দেরীতে ফেরার কারণে আরুণ আমি বাদে বাকী সবাইকে নিয়ে ফিরে গেছে । বাকী জীবন এখানেই কাটাবো বলে মনকে বেঁধে নিয়ে ট্রেক শুরু করলাম । বেতের শক্তপোক্ত লাটি ভাড়া পাওয়া যায় এখানে, ট্রেকিং-এর সঙ্গী হিসাবে । আর ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্ত উঠা যায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে । আমরা হেঁটে রওয়ানা হলাম। কিছুদূর ভালই উঠলাম, আস্তে আস্তে কমতে শুরু করলো বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা, দশ মিনিট হেঁটেই বিশ্রাম নিতে হচ্ছিল, হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম । যখনি বিশ্রামের জন্য বসি, বয়স্ক কোন আংকেল, আন্টি, বাচ্চা, সমবয়সী, কম বয়সী মেয়ে পাশ কাটিয়ে তর তর করে উঠে যাচ্ছে উপরে ।ব্যাপারটা খুব ইজ্জতে লাগার কারণে বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছে বারবার উবে যায় । উঠে পড়ি আবার । উপরে উঠার ২ঃ৩০ ঘন্টায় পরিচয় হয় দুইটি ইন্ডিয়ান পরিবার আর সলো ট্রাভেলার একজন মেয়ের সাথে, মেয়েটি দক্ষিণ ভারতের । তাদের সাথে গল্প-আড্ডায় অর্ধেক পথ উঠে গেলাম, বাকিটুকু উঠলাম উপরের দিকে যাওয়া আর টাইগার নেস্ট দর্শন শেষ করে নিচের দিকে নামতে থাকা, দেশী বিদেশী ছেলে মেয়ে, আবাল বৃদ্ধ দর্শনার্থীদের হাই-হ্যালো, অল দি বেস্ট,শুভ কামনা, হাউ ওয়াজ দ্যা ভিউ? ইজ দ্যাট ভিউ ওর্থি অর নট? আউর কিতনা উপার? কিতনা টাইম লাগেগা পৌঁছনেমে? এসব বলতে আর জিজ্ঞেস করতে এবং এসবের জবাব নিতে নিতে ।

মোটামুটি ২;৩০ ঘন্টা ট্রেকিং করে পৌঁছালাম নেস্টের কাছাকাছি,বাতাসে হেলতে দোলতে আমাদের আগেই পৌঁছে গেছেন আমাদের টিমের একমাত্র ডাক্তার বিপাশা আপুফোরকান ভাই আর টিমের সবচে ছোট সদস্য রবিন, রবিন মূলত ফোরকান ভাইয়ের ঠেলা গুঁতা খেয়ে এত তাড়াতাড়ি উঠে গেছে, নাহলে এই পিচ্চি আমার আগে উঠতে পারে? মাথা খারাপ ?

টাইগার নেস্টের এত কাছে পৌঁছে আপনার প্রথম কাজ হলো নেস্টের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা, অনেকক্ষণ । বিস্ময় আর মুগ্ধতা রেশ কাটতে সময় লাগবে । ১০,২৪০ ফুট উঁচুতে, পাহাড়ে খাঁজ কেটে এই অবকাঠামো তৈরী করা । দৈত্য সমান পাহাড়ের গায়ে খাঁজ কেটে খেলনায় মতো বসিয়ে দেওয়া এই মনস্ট্রি ছোটখাট কোন আবয়ব নয়, বেশ বড়সড় একটি স্থাপনা । যে ভাবনা আমায় বেশী ভাবাচ্ছে তা হলো, সামান্য মানুষ হাঁটা পথ বেয়ে এত উপরে স্থাপনা তৈরীর কাঁচামাল কত মানুষ মিলে, কতদিন ধরে উঠিয়েছে? মেঘও এখানে পায়ের অনেক নিচে, চারপাশ সবুজ পাহাড়ে ভরা । দূর থেকে ভেসে মেঘে ঢেকে যাওয়া নেস্ট যখন একটু একটু মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিবে, সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে চোখের যে পলক ফেলতে,পলক ফেলে এই ক্ষুদ্র সময়টুকুও নষ্ট করতে চাইবেন না আপনি, আপলক তাকিয়ে রইবেন, এত মধুর সে দৃশ্য । নেস্টের ঠিক কিছুদূর আগে যে ভিউ পয়েন্টটি আছে, মূলত ফটোসেশন জমে উঠে এখানেই । জায়গাটি নেস্টের সমান্তরালে। ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে পিছনে সুবিশাল আর নয়নাভিরাম টাইগার নেস্ট, যে নেস্ট দেখার জন্য এই ট্রেক, সাধনা, পরিশ্রম, তার পুরোটার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে রাখা নিশ্চয় মিস করতে চাইবেন না? আমরাও করিনি, মন ভরে ছবি তুলে, ক্যামেরায় সামান্য কিছু জায়গা অবশিষ্ট রেখে নেস্টকে ছুঁয়ে দেখতে রওয়ানা দিলাম ।ভিউপয়েন্ট থেকে খাড়া নিচে কয়েকশ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে হলো, হিসাবে নেমে এলাম নেস্ট থেকেও  অনেক নিচে ।সুতরাং নেস্টে পৌঁছাতে এর ঠিক নিচে গিয়ে আবার আরো কয়েকশ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে হলো । সে এক শান্তির জায়গা । প্রাচীন স্থাপৈত্যে নির্মিত এক বিস্ময়, একেকটা গাঁথুনি যেন এককটি শিল্প । ভেতরটা আরো বিস্ময়ে ভরা, অনেকগুলো মুর্তি আর প্রাচীন নিদর্শনে ঠাঁসা ।কিন্তু ছবি তোলা সম্পূর্ণ্রুপে নিষেধ ।একজন ফটোগ্রাফারের কাছে এরচে সব দুঃখ আর কি হতে পারে ? জায়গাটা এমন যে, ফিরতে না চাওয়ার মতো । সারাক্ষণ ঠান্ডা হাওয়া, সারি সারি গাছের ছায়া আর প্রাচীন আর বুনো সৌন্দর্যে ভরা নেস্ট তো আছেই । কিন্তু ফিরে যেতে হবে । দেশে অপেক্ষায় আছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা আর সবচে বেশী অপেক্ষায় আছে নিচে আমাদের ড্রাইভার আরুণ। বেশ কয়েকবার কল করে হুমকি দিয়েছে সে, আর দেরী করলে সবাইকে রেখে চলে যাবে । ফিরতি পথ ধরলাম । নামার সময় খুব একটা সময় ক্ষেপণ হয়নি । ফিরেই বাসে উঠে পড়লাম। বিদায়ের পালা, ভূটান থেকে, ভূটানের অসম্ভব ভাল মানুষগুলোর কাছ থেকে । বাস ফুন্টশলিং-এর পথ ধরলো । রাতে ফুন্টশলিং পৌঁছালাম, কিন্তু ভুটান ইমিগ্রেশন অফিস ততোক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে । সমস্যা নেই তাতে, রাতে আর কোথাও ফেরার তাড়া নেই । আরুণ আমাদের ভুটান গেইটে নামিয়ে দিলো । কারণ আজকের মত তার গাড়ির আর ভারত প্রবেশের অনুমতি নেই, আর দেখা হবেনা তার সাথে ।এতদিনের তার প্রতি সবার মায়া জন্মে গিয়েছিল ।তার বিদায় বেলায় আবেগী হয়ে পড়লাম অনেকে । ভূটানের ডিপার্চার সিল ছাড়ায় আমরা ভারত প্রবেশ করলাম, নেওয়ার দরকার মনে করলাম না ভারতের ইমিগ্রেশন সিলও, কারণ সব কাল সকালে নেওয়া যাবে । রাতে জয়গাও হোটেল কস্তুরীর অপরপাশের মসজিদ গলির মুসলিম হোটেলে গরুর গোশত দিয়ে ভর পেটে ভাত খেলাম, যেন অনেকদিন অভুক্ত ছিলাম ।তার কারণ ভূটানের বেশীরভাগ খাবারের সাথে আমাদের টেস্টবাটের দ্বন্দ্ব । সকালে উঠে ডিপার্চার আর ইমিগ্রেশন সেরে নিলাম । হোটেলের নিচে বাস আসলো ।নেমে দেখি আরুণই এসেছে তার বাস নিয়ে । তার আজকের অন্য সিডিউল বদল হওয়াতে সেই আমাদের বর্ডারে নামিয়ে দিয়ে আসবে ।তাকে আবার দেখতে পেয়ে অনেকদিন পর পুরানো বন্ধুকে ফিরে পাওয়ার মত খুশি হলাম সবাই । আস্তে আস্তে জায়গাও আলিদুয়ারপুর পার হয়ে তিনঘণ্টা পর চেংড়াবান্ধা বর্ডারে পৌঁছালাম । বর্ডারের কার্যক্রমে এবার বেশী সময় লাগলো না, তবে বরাবরই ভারত থেকেও বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে বেশী টাকা দিতে হলো । বিকালের মধ্যেই দেশে প্রবেশ করলাম । সন্ধ্যায় বুডিমারী বর্ডার থেকে ঢাকার বাস । পরদিন সকাল ৮-৯টার দিকে পৌঁছে গেলাম ঢাকা । ভূটান যাওয়ার সময় আলাদা আলাদা একেকজন মানুষ হিসাবে গেলেও, ভূটান পৌঁছে অল্প সময়েই আমরা ২০ সদস্যের একটি পরিবারে পরিণত হয়েছিলাম, হয়েছিলাম হাসি, আড্ডা আর খুনসুটির সঙ্গী । অল্প কয়দিনে গড়ে উঠা সম্পর্কে সবাই পরস্পরের বন্ধু, ভাই হয়েছিলাম আমরা, কোনকিছুই কাউকে ছাড়া যেন জমতোনা । ঢাকা নেমে এবার একেকজনের ফিরে যাওয়ার পালা, আপন ঠিকানায়, নীড়ে । একটি পরিবারের কাছে ফিরে যেতে,পেছনে রেখে যাওয়ার পালা সদ্য গড়ে উঠা আরেকটি পরিবার আর তার সদস্যদের । মাজেদ ভাই, নাসের ভাই, সানী ভাই, ফোরকান ভাই, জাবেদ ভাই,পার্থ ভাই, সুমাইয়া ভাবী, রবিন, সাফিত ভাই, দিশা, ফামি আপু,সারা আপু, বিপাশা আপু,ইমাম, শাহীন, মাথ্যিউ, তারেক, নিপু আর রাহুল মিলে এতদিন পরও আমরা একটি পরিবার আছি, তবে ফিজিক্যালি নয়, ভার্চুয়্যালি ।

 

ছবি গুলো কাহিনীর সাথে মিল রেখেই ক্রমান্বয়ে সাজানো হয়েছে, যে সিরিয়াল অনুসারে আমরা শহর থেকে শহরে গিয়েছি,গিয়েছি জনপদ থেকে পাহাড়ে, ভ্যালীতে । ঠিক সেই সিরিয়ালেই আপলোড করেছি সব ছবি । লেখার মাঝে ডুব দিয়েই ঘূরে আসুন ভুটান, তাতে ছবিগুলো যোগ করবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির স্বাদ ।

 

পরিবেশ রক্ষার্থে ভ্রমণকালীন সময়ে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না, পরিবেশ বাঁচলে আপনি বাঁচবেন ।

0 comments

Leave a comment

Login To Comment